May 27, 2026, 5:05 pm

উৎসবের মঞ্চে নেই বাংলাদেশ, বিতর্ক আর রাজনীতির ছায়ায় শুরু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

উৎসবের মঞ্চে নেই বাংলাদেশ, বিতর্ক আর রাজনীতির ছায়ায় শুরু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

ক্রিকেট বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, উৎসব আর ব্যাট–বলের লড়াই। কিন্তু এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুই হলো তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। মাঠের খেলাকে ছাপিয়ে গেছে মাঠের বাইরের রাজনীতি। সেই রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী—বাংলাদেশ। কোনো ক্রিকেটীয় ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাচ্ছে না নিয়মিত সদস্য এই দলকে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি বহুল ব্যবহৃত একটি সংলাপ—‘খেলা যে চলছে কোন লেভেলে’—এবার যেন হুবহু মিলে গেল বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তবতায়। রাজনীতির খেলা বহুদিন ধরেই ক্রীড়াঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত–পাকিস্তান দ্বন্দ্ব তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তবে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেই পুরোনো গল্পে যুক্ত হয়েছে নতুন চরিত্র—বাংলাদেশ।

ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে আজ পর্দা উঠেছে এবারের বিশ্বকাপের। কিন্তু শুরুতেই টুর্নামেন্টটি হারিয়েছে উৎসবের একটি বড় অংশ। কারণ, প্রতিযোগিতার মঞ্চে নেই বাংলাদেশ। বিষয়টি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা ক্রিকেটীয় নয়। পারফরম্যান্স, র‍্যাঙ্কিং কিংবা যোগ্যতার কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল না বাংলাদেশ। তবুও শেষ মুহূর্তে দলটির নাম বাদ পড়ে, জায়গা পায় স্কটল্যান্ড। ক্রিকেটের যুক্তির চেয়ে এখানে প্রাধান্য পেয়েছে আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সমীকরণ—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঘটনার সূত্রপাত আইপিএলে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে। কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নেওয়ার পর ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের মুখে পড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। সেই চাপের পরিপ্রেক্ষিতে বিসিসিআই নির্দেশ দেয় মুস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

এরপরই সামনে আসে নিরাপত্তা ইস্যু। বাংলাদেশ দল, কোচিং স্টাফ, সমর্থক ও সাংবাদিকদের ভারতে অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতীয় মাটিতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ। বিষয়টি নিয়ে আইসিসির সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হলেও কোনো সমাধান আসেনি। বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অনড়, আইসিসিও নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ‘সহজ সমাধান’ হিসেবে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্টের বাইরে রাখার পথ বেছে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ জানালেও আইসিসি সিদ্ধান্ত বদলায়নি। অনেকের ধারণা, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ভারতের প্রভাব কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব কতটা গভীর।

তবে নীরবতা পুরোপুরি থাকেনি। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ইংলিশ ধারাভাষ্যকার ও সাবেক ক্রিকেটার নাসের হুসেইন। তিনি বাংলাদেশের অবস্থানের প্রশংসা করে বলেন, মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনাই পুরো সংকটের সূত্রপাত এবং নিজেদের ক্রিকেটারের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে।

বাংলাদেশ ইস্যুতে শুরু থেকেই সরব ছিল পাকিস্তান। সংহতি জানিয়ে তারা প্রথমে পুরো বিশ্বকাপ বয়কটের আভাস দেয়, পরে ভারতের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয়।

এতে বড় আর্থিক সংকটে পড়ে আইসিসি। শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তানকে খেলতে রাজি করাতে ব্যাকডোর কূটনীতি চালাচ্ছে সংস্থাটি। নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। তবুও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। শেষ খবর অনুযায়ী, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকিট বিক্রিও বন্ধ করে দিয়েছে আইসিসি।

সব মিলিয়ে নিয়মিত সদস্য বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। যদি শেষ পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান ম্যাচও মাঠে না গড়ায়, তবে এটি হবে টুর্নামেন্টটির জন্য আরও বড় ধাক্কা। প্রশ্নবিদ্ধ হবে আইসিসির ভূমিকাও।

এই পুরো অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে বাংলাদেশের দর্শকদের। বিশ্বকাপ মানেই উৎসব, অপেক্ষা আর আবেগের জায়গা। অথচ এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেই উৎসবকে ঢেকে দিয়েছে রাজনীতির কালো ছায়া। মাঠের বাইরের দ্বন্দ্বে হারিয়ে গেছে ক্রিকেটের আনন্দ—আর উৎসবের মঞ্চে অনুপস্থিত থেকেছে বাংলাদেশ।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com