May 21, 2026, 4:29 pm
তন্ময় ইসলাম: দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক কাঠামোয় রূপ দিতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশাল কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ (পিইডিপি-৫) নামে এই উদ্যোগের আওতায় শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম, শিক্ষকদের জন্য ট্যাব, ডবল শিফট স্কুলকে এক শিফটে রূপান্তর এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তরের মতো নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৩৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ও অনুদান থেকে পাওয়া যাবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। তবে কর্মসূচির ব্যাপকতা বাড়ায় আরও বেশি বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পিইডিপি-৫ শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; বরং দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি বড় উদ্যোগ।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এতে বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’। এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় তিন লাখ ৭০ হাজার শিক্ষককে ট্যাব দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশের প্রায় এক কোটি ছয় লাখ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে দুই শিফটে পরিচালিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে ধাপে ধাপে এক শিফটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সময় বাড়বে এবং শেখার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।
পিইডিপি-৫-এ মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সহায়তা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তর এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ নামে একটি কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় পিইডিপি-৫ বাস্তবায়নের জন্য মোট এক হাজার ৭০৯টি পদ ও সেবার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৫৩১ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক, উপ-প্রকল্প পরিচালক, শিক্ষা কর্মকর্তা, গবেষণা কর্মকর্তা ও ক্রয় কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বেশির ভাগ পদ প্রেষণ, অতিরিক্ত দায়িত্ব অথবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পূরণের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, পিইডিপি-৫-এর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং তা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব বাজেটে বড় কোনো সমস্যা নেই, তবে বিদেশি অনুদান সংগ্রহে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ।
এদিকে শিক্ষাবিদরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো ও প্রযুক্তি নয়, শিক্ষার্থীদের শেখার মান উন্নয়নই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকের সংখ্যা, যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, এখনো অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর শেষ করেও ঠিকমতো পড়তে বা মৌলিক গণিত করতে পারে না। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি শিক্ষার মূল দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে।
এসআর
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.