May 1, 2026, 3:50 am

দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে ৯৯৫ কোটি টাকার ঋণ

দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে ৯৯৫ কোটি টাকার ঋণ

দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে অস্তিত্বহীনসহ ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে ৯৯৫ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে বেসিক ব্যাংক। অনেকের ক্ষেত্রে ভুয়া জামানত অথবা জামানত ছাড়াই দেয়া হয়েছে ঋণ। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল না ক্রেডিট কমিটির অনুমোদন।

শুধু তা-ই নয়, ঋণ দেয়া হয়েছে অন্য ব্যাংকের খেলাপিদেরও, যা বিদ্যমান আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া অনিয়মিতভাবেও (অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া) একাধিক প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে এসব ঋণ।

বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য। ‘বেসিক ব্যাংকের অডিট (তৃতীয়)’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রধানন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে গেছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, এর আগে সিএজি অফিস বেসিক ব্যাংকের ওপর আরও দুটি অডিট সম্পন্ন করেছে। প্রথম অডিটে ১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় অডিটে ৯৩০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির সন্ধান পেয়েছে। তিনটি অডিট রিপোর্টে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়ম উদ্ঘাটন করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান এমএ মজিদ বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট হয়েছে। এ অডিটের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে সিএজি রিপোর্টের ভিত্তিতে অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায় করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও এসব তোয়াক্কা না করে ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড ঋণ অনুমোদন দিয়েছিল। এখন এর জন্য দায়ী সংশ্লিষ্টরাই।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সিএজির অডিট রিপোর্ট দেয়ার পর আমার দুটি প্রশ্ন- প্রথমটি হচ্ছে, বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা জড়িত না থাকলে এতবড় ঋণ জালিয়াতি ও দুর্নীতি কীভাবে হয়। দ্বিতীয় হচ্ছে, সিএজি সাহসের কাজ করেছে। দুদক তাদের তথ্য ব্যবহার করে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সিএজির প্রতিবেদনটি দুদক আমলে নিলে দেশবাসী উপকৃত হবে।

সূত্রমতে, বেসিক ব্যাংকের ওপর পরিচালিত তৃতীয় অডিট রিপোর্টে বলা হয়, শান্তিনগর শাখার গ্রাহক মেসার্স টেলিউজ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে মোবাইল টেলিকম ব্যবসা পরিচালনার জন্য সিসি হাইপো ঋণ ১০ কোটি টাকা দেয়া হয়।

এ ঋণের বিপরীতে সম্পত্তির কোনো বৈধ মালিকানা না থাকার পরও আরও ৩০ কোটি টাকা ঋণসীমা বাড়ানো হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের পরিদর্শন টিম এ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।

একই গ্রাহকের অপর প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্রপেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে মোবাইল ব্যবসা পরিচালনার জন্য ১২ কোটি টাকা ঋণ দেয়। কিন্তু এ টাকা দিয়ে গ্রাহক ২৩৩ শতক জমি ক্রয় করে প্রথম প্রতিষ্ঠান টেলিউজ ইন্টারন্যাশনালের নামে। কিন্তু ঋণ নিয়ে কোনো টাকা ফেরত দেয়নি। এ গ্রাহকের কাছে ঋণের সুদ-আসলে আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে ৬৩ কোটি টাকা।

অডিট রিপোর্টে এ অনিয়ম প্রসঙ্গে বলা হয়, এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া এবং ঋণের সীমা বাড়ানোর ব্যাপারে কোনো যৌক্তিকতা নেই- এমন মন্তব্য করেছিল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ঋণ কমিটি। কিন্তু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ক্রেডিট কমিটির আপত্তি আমলে না নিয়ে ঋণ দিয়েছে। এ ক্ষতির জন্য পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা দায়ী।

অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মেসার্স ইমারোল্ড অটো ব্রিকসের মালিক সৈয়দ মাহবুল গনিকে জামালপুর সদরে অটো ব্রিকস নির্মাণের জন্য ৪২ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শাখা এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করেনি।

এছাড়া প্রকল্পের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। আর প্রতিষ্ঠানটির কোনো লাইসেন্স ছিল না। ঋণ নেয়ার পর কোনো টাকা পরিশোধ করেনি। ফলে হিসাবটি সুদে-আসলে প্রায় ৫৯ কোটি টাকায় উঠে কুঋণে পরিণত হয়।

পাশাপাশি একই গ্রাহকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইমারোল্ড স্পেশালাইজড কোল্ডস্টোরেজ (লাইসেন্স নং-০১১৮৯৬৫) নির্মাণের জন্য ২৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। একই গ্রাহকের আরও একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সৈয়দ ট্রেডার্সকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। সহায়ক জামানত ঘাটতি রেখে এসব ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো ঋণের অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি।

অডিট রিপোর্টে আরও বলা হয়, মেসার্স অ্যাগ্রোব্যালেন্স ফার্টিলাইজার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ঋণ দেয়া হয়েছে ৩৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্ট অনুযায়ী, এ প্রতিষ্ঠানের মালিক একজন ঋণখেলাপি।

কিন্তু দেখা গেছে, ঋণের জন্য আবেদনের পরের দিন ব্যাংকের বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। ঋণের জন্য কোনো জামানতও নেয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে গ্রাহকের কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও নেই।

দিলকুশা শাখার গ্রাহক মেসার্স এটলাস ফুড অ্যান্ড বেভারেজকে খাদ্য ও পানীয়-জাতীয় পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু যে জামানত দেয়া হয়েছে, তা মূল্যায়ন করে দেখা গেছে, জামানতের পরিমাণ ২৪ কোটি টাকা। গ্রাহকের পণ্য উৎপাদনের আগেই পুরো অর্থ দেয়া হয়, যা পরবর্তী সময়ে ঋণটি আদায় হয়নি।

ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় আরও দেখা গেছে, মেসার্স রিয়ালেন্স শিপিং একটি জাহাজ মেসার্স বেলায়েত নেভিগেশনের কাছ থেকে কেনার জন্য আবেদন করে। এ গ্রাহককে ঋণ দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে ঋণ অনুমোদন কমিটি। এরপরও দিলকুশা শাখা থেকে ২১ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। ঋণ পাওয়ার পর গ্রাহক আত্মগোপন করেন। পরে দেখা যায়, এ গ্রাহকের আইডি নং, খাজনার ডকুমেন্ট, জামানতের মিউটেশন ও দলিল সবকিছুই ভুয়া উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

এছাড়া জমি বন্ধক না নিয়ে প্রধান শাখার গ্রাহক মেসার্স বর্ষণ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ৪৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর প্রকল্পের জমি বন্ধক না রেখে একই শাখার গ্রাহক বিজে প্রপার্টিজ ও অনলাইন প্রপার্টিজ হাতিয়ে নিয়েছে ৭৬ কোটি টাকা।

বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ছক : সিএজি এ পর্যন্ত তিনটি অডিট সম্পন্ন করেছে বেসিক ব্যাংকের ওপর। এতে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে ভুয়া জামানত নিয়ে ঋণ দিয়েছে ৪২৯ কোটি টাকার, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বের করে নেয়া হয়েছে ১৬ কোটি টাকার, জামানতবিহীন ও কম জামানত দিয়ে ঋণ বের করা হয় ৬৩৫ কোটি টাকা। এছাড়া ঋণ কমিটির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঋণ দেয়া হয় ২১ কোটি টাকা। এছাড়া বিবিধ খাতে ঋণ দেয়া হয় ৫৮ কোটি টাকা।
সূত্র: যুগান্তর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com