July 11, 2026, 7:46 pm

২ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার: সিপিডি

২ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার: সিপিডি

বাংলাদেশে কর স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বড় রকমের ঘাটতি রয়েছে। কর ফাঁকি এবং কর এড়ানো বা অব্যাহতির কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। যার পরিমাণ ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে দুই লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অতিরিক্ত এই রাজস্ব আদায় সম্ভব হলে স্বাস্থ্যখাতের বাজেট ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

চলমান অবস্থা থেকে উত্তরণে কর জালের আওতা বৃদ্ধি এবং কর অব্যাহতির প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সোমবার (৩ এপ্রিল) ‘করপোরেট খাতে কর স্বচ্ছতা: বাজেটে সরকারি আয়ের অভিঘাত’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ তথ্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, কর অব্যাহতি নির্দিষ্ট সময় ও লক্ষ্যভিত্তিক হওয়া উচিত। আর্থিক খাতের সব লেনদেন সমন্বিত হওয়া দরকার। এ সম্পর্কিত রিপোর্ট ইন্টিগ্রেট হওয়া উচিত। এর অংশ হিসেবে ডিজিটালাইজেশন ও ইন্টারনেটভিত্তিক ট্রানজেকশন হওয়া উচিত। কর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলক সাস্টেইনেবল রিপোর্টিংয়ে যাওয়া দরকার।

করপোরেট খাতে কর স্বচ্ছতা সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে তিনি বলেন, গবেষণাটি যৌথভাবে সম্পন্ন করেছেন সিপিডি ও খ্রিষ্টান এইড। ১২ জন অডিটরস ও রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ট্যাক্স জাস্টিস রিপোর্ট বলছে- কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর মাধ্যমে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪৮৩ বিলিয়ন ডলার কর ক্ষতি হচ্ছে। যার মধ্যে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির মাধ্যমে ৩১২ বিলিয়ন ডলার ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে ১৭১ বিলিয়ন ডলার কর ক্ষতি হচ্ছে। এর অভিঘাত পড়ছে স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে।

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে করপোরেট ট্যাক্স হার কমে আসছে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে বেড়েছে। করপোরেট কর হার কমিয়ে কর জাল বাড়িয়ে ট্যাক্স আদায় করা দরকার। করহার বাড়ানোর ফলে প্রচুর কালো টাকা থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে করপোরেট ট্যাক্স রেট দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। কিন্তু ট্যাক্স জিডিপি রেশিও আফগানিস্তানের পরে সর্বনিম্ন। পার্সোনাল ও সেলস ট্যাক্স কম না, কিন্তু সেটা আমরা নিতে পারছি না। উচ্চ করহার দিয়েও এর সুফল আমরা ভোগ করতে পারছি না। আবার কর কমিয়ে দিলেও রাজস্ব বাড়ে, সেটারও নিশ্চয়তা নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় ট্যাক্স জিডিপি রেশিও এবং করহারের মধ্যে ফারাক বাংলাদেশে সর্বোচ্চ।

সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, ৬৮ শতাংশ মানুষ করযোগ্য আয় করার পরও আয়কর দেন না। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর দেওয়ার যোগ্য হওয়ার পরও কর দেন না। বিপুল পরিমাণ কর আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এটা কিন্তু ট্যাক্স জিডিপির ক্ষেত্রে মাথা ব্যথার কারণ। কর জিডিপির অনুপাত না বাড়ারও বড় কারণ এটি। অন্যদিকে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে দুই লাখ ১৩ হাজার কোম্পানি রেজিস্ট্রার্ড হলেও রিটার্ন দাখিল করে মাত্র ৪৫ হাজার কোম্পানি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আকার ৩০ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে করের পরিমাণ ছিল ২০১০ সালে ২২ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। ছায়া অর্থনীতিতে ৮৪ হাজার কোটি টাকা কর ক্ষতি হচ্ছে। যা জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। এ টাকা যদি পাওয়া গেলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় তিনগুণ বাড়ানো যেত। অর্থাৎ করনেট বৃদ্ধির প্রতিবদ্ধকতা হচ্ছে প্রধান অপ্রাতিষ্ঠানক খাত। বড় অংশই করের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে কর ফাঁকি দিন দিন বাড়ছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, কর অসচ্ছতাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কর ফাঁকি ও কর এড়ানো। কর ফাঁকি দিতে গিয়ে কোম্পানি তার প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে থাকে। অন্যদিকে কর এড়ানোর বিষয়টি হলো লিগ্যাল ফ্রেমের আওতায় সরকারের দেওয়া সুবিধা গ্রহণ করে থাকে। আমাদের দৃষ্টিতে এটাও কর অস্বচ্ছতা।

কর ফাঁকি ও কর এড়াতে আর্থিক তথ্য গোপনের প্রবণতা বেড়েছে উল্লেখ করে সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক বলেন, বৈশ্বিক ইনডেক্সে কর ফাঁকি ও কর এড়াতে আর্থিক তথ্য গোপন করার প্রবণতায় ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫২তম। বাংলাদেশ ২০২২ সালে আগের বছরের চেয়ে দুই ধাপ পিছিয়েছে। অর্থাৎ দেশে আর্থিক তথ্য গোপন করার প্রবণতা বেড়েছে।

কর ক্ষতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজস্ব কর্মকর্তা ও অডিটরদের সঙ্গে কথা বলে যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে তা হলো, কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর মাত্রা ব্যাপক। কেউ কেউ বলছেন, ট্যাক্স লস যেটি হচ্ছে কর এড়ানোর জন্য সেটি ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আর কর লস যেটি হচ্ছে কর ফাঁকির জন্য সেটি ১৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, কর ফাঁকি যদি ৮০ শতাংশ হয় তাহলে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার মতো রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। কর ফাঁকি ৫০ শতাংশ ধরা হলে রাজস্ব হারানোর পরিমাণ ৪১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে আমাদের ৪১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত কর আদায়ের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কর এড়ানোতে যে ব্যয় হচ্ছে সেটা যদি ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হয় তাহলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ৬৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মত।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com