April 30, 2026, 1:25 pm
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মঙ্গলবার হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫৩ কোটি ৪০ লাখ (৩.৫৩ বিলিয়ন) ডলার। গত অর্থবছরের এই তিন মাসে এই সূচকে কোনো উদ্বৃত্ত ছিল না, বরং ৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঘাটতি ছিল।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এই উদ্বৃত্তকে মহামারীর ধকল সামলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রমাণ হিসেবে’ দেখলেও কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন গবেষকরা।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাব উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হল, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।
তিনি বলেন, ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বড় উদ্বৃত্ত হওয়ার পেছনে রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার পাশাপাশি মহামারীর মধ্যে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি অনেক কমে যাওয়ারও ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৪৮৪ কোটি ৯০ লাখ (প্রায় ৫ বিলিয়ন) ডলারের বড় ঘাটতি নিয়ে।
তার আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল আরও বেশি, ৫১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৯৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
ব্যালেন্স অব পেমেন্টে এই বড় উদ্বৃত্তের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম, বাংলাদেশের অর্থনীতি মহামারীর ধকল সামলে ঘুঁরে দাড়িয়েছে। তার প্রমাণ অর্থবছরের তিন মাসেই সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি এই উদ্বৃত্ত।
অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অক্টোবর মাসের ২১ দিনে ১৫৪ কোটি ডলার পঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত সেপ্টেম্বর মাসের পুরো সময়ের প্রায় সমান। সেপ্টেম্বর মাসে ১৬৪ কোটি ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।
জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় আড়াই শতাংশের বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। তবে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বড় উদ্বৃত্ত থাকা অর্থনীতির জন্য স্বস্তির হলেও সার্বিক বিবেচনায় আত্মতুষ্টিতে না ভুগে বিচক্ষণতার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উপর জোর দিয়েছেন আহসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেন, অনেক প্রবাসী কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকে তার শেষ সঞ্চয়টুকু দেশে পাঠাচ্ছেন। সে কারণে রেমিটেন্স বেড়েছে। আগামী দিনগুলোতে রেমিটেন্সে খুব ভালো খবর আসবে বলে আমার কাছে মনে হয় না। রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই শঙ্কা আছে। অন্যদিকে আমদানি খরচ বেড়ে গেলে এই উদ্বৃত্ত থাকবে না। রিজার্ভও এই উচ্চতায় থাকবে না।
বাণিজ্য ঘাটতি অর্ধেক
বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ করেছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা কমে ২০৩ কোটি ৯০ লাখ (২.০৩ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে।
গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৩৮৪ কোটি ডলার।
জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৯৬৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করেছে। আর আমদানিতে ব্যয় করেছে এক হাজার ১৭৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
এ হিসাবেই এই তিন মাসে পণ্য বাণিজ্যে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এই তিন মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। আর আমদানি ব্যয় কমেছে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতিও কমেছে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতের ঘাটতি ছিল ৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর এ বছরের একই সময়ে তা কমে ৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
মূলত বীমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়।
রেমিটেন্স বেড়েই চলেছে
অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৬৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত বছর এই তিন মাসে পাঠিয়েছিলেন ৪৬১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিন মাসে রেমিটেন্সে এতো বেশি প্রবৃদ্ধি কখনই হয়নি।
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও উদ্বৃত্ত
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও (ওভারঅল ব্যালেন্স) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
২০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ হয়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৩০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে।
আর্থিক হিসাবে ঘাটতি
তবে আর্থিক হিসাবে (ফাইনানশিয়াল অ্যাকাউন্ট) খানিকটা ঘাটতি রয়েছে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। এই বছরের একই সময়ে তা ৭৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
আহসান মনসুর বলেন, করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গত অর্থবছরের শেষ দিকে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার মোটা অংকের ঋণের কারণে আর্থিক হিসাবে বেশ উদ্বৃত্ত ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ বাংলাদেশে এসেছে ১৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত বছরের এই তিন মাসে এসেছিল ৯০ কোটি ১০ লাখ ডলার।
শতাংশ হিসাবে এই তিন মাসে বিদেশি ঋণ-সহায়তা বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এফডিআই কমেছে ২৪.৬%
জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৫৪ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাংলাদেশে এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এই তিন মাসে এফডিআই কমেছে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
এই সময়ে নিট এফডিআই এসেছে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৭ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসে তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটাকেই নিট এফডিআই বলা হয়।