August 27, 2026, 9:57 pm
বাংলাদেশ ব্যাংকের হ্যাকিং সতর্কতা প্রত্যাহারের পরও দেশের কিছু ব্যাংক এখনও তাদের এটিএম পরিষেবা, কার্ড ও অনলাইন লেনদেন সীমাবদ্ধ রেখেছে। ২৭ আগস্ট থেকে চলছে এই সীমিত সেবা। হ্যাকিং ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করে ব্যাংকগুলো। তবে ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ গভর্মেন্ট কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমের (সিআইআরটি) সবুজ সংকেত পেয়ে সাইবার হ্যাকিং সতর্কতা প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও রাতের বেলায় এটিএম সেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক গ্রাহক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক এখনও তাদের এটিএম পরিষেবাগুলো রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বন্ধ রেখেছে। ফলে রাতের বেলায় এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না গ্রাহকরা। সতর্কতা প্রত্যাহারের পরেও সীমিত ব্যাংকসেবায় গ্রাহকদের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই।
রবিউল হক (ছদ্মনাম) নামের ব্র্যাক ব্যাংকের এক গ্রাহক জানিয়েছেন, জরুরি চিকিৎসার জন্য গতকাল রাতে তার টাকার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তিনি এই ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারেননি। কেবল রবিউল হকই নন, রাতে ব্যাংকের সীমাবদ্ধ এটিএম সেবার কারণে ওই ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক বিপাকে পড়ছেন।
এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আর এফ হুসেইন বলেন, আমরা আমাদের এটিএম সেবাগুলো রাত ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রেখেছি। আমরা আরও কয়েক দিন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করব। সীমাবদ্ধ এটিএম পরিষেবার কারণে সাধারণ গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না বলে মনে করেন তিনি। কারণ এসএমএসের মাধ্যমে বিষয়টি গ্রাহকদের আগেই জানানো হয়েছে।
এক্সিম ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট সঞ্জীব চ্যাটার্জি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো চিঠি পাইনি। তাই আমাদের এটিএম সেবার সীমাবদ্ধতা কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, আগস্টে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সিআইআরটিকে জানায়, উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গ্রুপ বাংলাদেশের ব্যাংক হ্যাক করার চেষ্টা করছে। সিআইআরটি বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানালে ২৭ আগস্ট ব্যাংকগুলোকে সাইবার হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। উত্তর কোরিয়ার ওই হ্যাকার গোষ্ঠীর নাম বিগল বয়েজ। তারা এটিএম বুথ ও জাল লেনদেনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ চুরি করার চেষ্টা করছে। গ্রুপটি এর আগেও সাইবার হামলার মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার আত্মসাৎ করেছে বলে জানিয়েছে সিআইআরটি।
এই সতর্কতার কারণে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক এখনও তাদের এটিএম, কার্ড ও অনলাইন লেনদেনকে সীমাবদ্ধ রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কেবল এটিএম, কার্ড ও অনলাইন লেনদেনকে সীমাবদ্ধ রেখে হ্যাকিং এড়ানো সম্ভব নয়। এটিএম সেবা সীমাবদ্ধ করা এবং অনলাইন লেনদেনে ঝুঁকি এড়ানোটা প্রাথমিক সমাধান।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সাইবার হামলার ঝুঁকি কমে এসেছে বলে জানিয়েছে সিআইআরটি। তারপর আমরা সতর্কতা প্রত্যাহার করে নিয়েছি। বিষয়টি দেশের সব ব্যাংককে অবহিত করেছি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) একটি গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যাংকের আইটি বিভাগ ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তাদের পরিচালিত সুইচ, নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়াল এবং ইমেল গেটওয়ের অভাব রয়েছে, যা ব্যাংকগুলোয় নেটওয়ার্ক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিআইবিএমের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ও অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, এটিএম সার্ভিসের সীমাবদ্ধতা এবং রাতে ব্যাংকগুলোর অনলাইন লেনদেন বন্ধ করাটা প্রাথমিক সমাধান। তবে স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা জোরদার করা দরকার। আমাদের দেশে কিছু ব্যাংক তথ্যপ্রযুক্তির সুরক্ষার জন্য খুবই দুর্বল এবং কিছু ব্যাংক আইটি সুরক্ষার পক্ষে খুবই শক্তিশালী। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তাদের সুরক্ষা জোরদার করার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
ব্যাংক এশিয়ার সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, আইটি সুরক্ষার জন্য আরও বিনিয়োগের প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের জন্য সাইবার সুরক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।