April 30, 2026, 3:34 pm

করোনা মোকাবিলায় সরকারের কৌশল সফল: পরিকল্পনামন্ত্রী

করোনা মোকাবিলায় সরকারের কৌশল সফল: পরিকল্পনামন্ত্রী

করোনা মোকাবিলায় প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই দ্বিতীয় ধাপ মোকাবেলা করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। কারণ, জনসংখ্যা ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রথমে ও পরে উত্তরণ এই কৌশল সফল হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত কোভিড-১৯ মোকাবিলা এবং টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকারের নেয়া প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে ৩ পর্বের ধারাবাহিক আলোচনার ২য় দিনে কর্মসৃজন ও গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন শীর্ষক মত বিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেছেন, ‘আমার দৃষ্টিতে প্রথম ধাক্কা বা দ্বিতীয় ধাক্কায় তেমন কোনো বড় তারতম্য চোখে পড়েনি। করোনায় আক্রান্ত ও সংক্রমণের কথা যদি বলেন অথবা মৃত্যু সংখ্যা যদি বলেন সে রকম আপ-ডাউন রেট কিন্তু দেখিনি।

সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাক্কায় আমরা একটু হকচকিয়ে উঠেছিলাম। তারপর আমরা যে কৌশল নিয়েছি সেটা ছিল ত্রিমুখী। মোকাবিলা করো, তারপর আক্রমণ করো। আমরা মোকাবিলা করি, মৃত্যু কমাই, ইফেকশন কমাই, সেবা দেই। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবিকা ও কাজ যাতে আরও নিচে নেমে না যায় সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। নইলে কিন্তু ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হবে। প্রথম ধাক্কায় এটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর কৌশলী বার্তা। সময় প্রমাণ করেছে তার কৌশল বাস্তব ছিল। অনেকেই একমত ছিলেন না, কিন্তু এটা কাজে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতে আর্থ-সামাজিক পরিমাপ বিচার করে আমাদের কৌশল মোটামুটি পরিপূর্ণ হয়েছে। আমাদের সকল ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। আমাদের অক্সিজেনের যন্ত্রপাতি, ডাক্তার, সেবাখাতে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও কৌশলে বড় কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।

এসময় প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থায়ন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ না হলেও করোনা মোকাবিলায় দেয়া প্রণোদনা প্যাকেজের ৯০ ভাগ অর্থ ছাড় দেয়া সম্ভব হবে। কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে দেয়া প্রণোদনার মাত্র ৪১ শতাংশ উদ্যোক্তাদের হাতে গেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ খাতে দ্রুত অর্থছাড়ে জামানত থেকে সরে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করা হয়েছে। এই স্কিমের আওতায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করতে পারলেই প্রণোদনা প্যাকেজের শতভাগ সুবিধা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। সেখানে তিনি করোনা মোকাবিলায় সরকারের নেয়া নানা উদ্যোগের চিত্র তুলে ধরেন। জানান, করোনা মোকাবিলায় পরিকল্পনা করতে মাথায় রাখা হয় যেন, প্রাণহানি সর্বনিম্ন থাকে, ক্ষুধার্তের সংখ্যা না বাড়ে, কর্মের সুযোগ অব্যাহত থাকে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল থাকে। আর এতে মেলে সুফল। মার্চ থেকে অক্টোবর, করোনা আক্রান্তের ৮ মাসের প্রথম চার মাস ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির ধারাবাহিক উত্তরণ ঘটতে থাকে পরের চার মাসে। হিসাব বলছে, জুলাই থেকে অক্টোবর চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ৯৪ শতাংশ, গেল ৫ মাসে প্রবাস আয়ের প্রবাহ বেড়েছে ৪১.৩ শতাংশ; যদিও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের হিসাবে আমদানি ব্যয় কমেছে ১১.৪ শতাংশ।

এসময় এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ড. মো. মাসুদুর রহমান বলেন, করোনা মোকাবিলায় সিএসএমই খাতে দেয়া ২০ হাজার কোটি টাকার সবেমাত্র অর্ধেক পরিমাণ অর্থ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো গেছে। আর ঋণ প্রাপ্তির নানা শর্তে ৮০ শতাংশ উদ্যোক্তাই এই ঋণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এই কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা করোনার কারণে পুঁজি হারিয়েছেন। কারণ, তারা এবার বৈশাখী উৎসব আর ঈদের মতো উৎসব কাজে লাগাতে পারেনি তাদের ব্যবসা সচল রাখতে।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটা ভালো দিক যে এই মহামারিকালেও বাংলাদেশ খাদ্য সংকটে পড়েনি। যদিও অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। সংকট উত্তরণে তাই অবশ্যই কৃষিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচানায় রাখতে হবে। কারণ, কর্মসংস্থানের ৪০ ভাগই এ খাতের আর জিডিপির ১৩ শতাংশের যোগানও দিয়ে থাকে এই কৃষিখাতই। তাই ঋণ সুবিধা, নীতিগত সুবিধা ও পণ্যের বাজারজাতকরণে এই খাতের সঙ্গে যুক্তদের পাশে থাকতে হবে। তাদের সমস্যাগুলো বুঝতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজার পর্যন্ত তাদের পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই কর্মসংস্থান, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও এবং অর্থ ও পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

করোনা সংকট মোকাবিলায় গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক- এডিবি’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি মনমোহন প্রকাশ। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের তাণ্ডব শহরের তুলনায় গ্রামে বেশ কম। তাই, এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সামনে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার পর্যবেক্ষণ, অনেকক্ষেত্রেই উৎপাদকরা (চাষি/কৃষক) উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখলেও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তা যথাযথ উপায়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি বড় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষকদের পাশে থাকার জন্য কৃষিঋণের পাশাপাশি কৃষি বীমাকে সতর্কতা ও সহজভাবে আমলে নেয়া দরকার বলেও মনে তিনি। এতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান দুই দিক থেকেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।

করোনার ধাক্কা মোকাবেলায় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণাসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় সরকারের নেয়া তড়িৎ পদক্ষেপের প্রশংসা করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, আগামী বছরই শক্তমত ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি। সে লক্ষ্য সামনে রেখেই উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করতে কাজ করছে এফবিসিসিআই।

সভায় সরকারের নেয়া উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সচিব ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, একটা ভালো দিক যে গেল জুলাই থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। তবে এটা শুধু ধরে রাখলেই চলবে না। এখানে গতি আনতে হবে। এজন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে যদিও তা সহজ হবে না। আর এটা করতে গেলে অবশ্যই ক্ষুদ্র অর্থনীতিকে আমলে নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এশিয়ান প্লাস-সহ জোটভিত্তিক ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রাসারণের দিক নিয়েই ভাবতে হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিগগিরই প্রণোদনা প্যাকেজে দেয়া শতভাগ অর্থ ছাড় হয়ে যাবে। করোনাকালে সৃষ্ট সমস্যায় শতভাগ বিধবাভাতা দেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে এ সমস্যা থাকবে না।

বিজনেস নিউজ/এমআরএম

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com