June 27, 2026, 6:23 pm
তন্ময় ইসলামঃ ভাগ্য বদলের নামে ৪০ কোটি টাকার প্রকল্পে ১৯৬ অডিট আপত্তি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই প্রশিক্ষক নিয়োগ, ৮ কোটি ১১ লাখ টাকার বেশি অনিয়মিত পরিশোধ অতিরিক্ত খাবার বিল, যাতায়াত ভাতা ও সম্মানীতে লাখ লাখ টাকার অনিয়ম আয়কর কম কেটে সরকারের অন্ত্মত ২১ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগব কাগজে ১০০% বাসত্মবায়ন, কিন্তু কর্মসংস্থানে চরম ব্যর্থতা প্রশিক্ষণ নিয়েও পেশায় টিকে আছেন মাত্র ১৯৩ জন লাইসেন্স-সনদ না পেয়ে অনেক প্রশিক্ষণার্থী ফিরেছেন আগের পেশায়
লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা মজিদ মিয়া দিনমজুরির কাজ করেন। অভাবের সংসারে তাঁর মাধ্যমিক পাস ছেলেটাকে একটা টেকসই কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল স্থানীয় সমাজসেবা অফিস। বলা হয়েছিল, সরকারি এক মহতী প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে ড্রাইভিং শিখিয়ে লাইসেন্সসহ চাকুরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। মজিদ মিয়ার ছেলে ২১ দিন সেই প্রশিক্ষণে যোগও দিয়েছিল। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে মেলেনি কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স, মেলেনি কারিগরি বোর্ডের কোনো বৈধ সনদও। উল্টো ২১ দিনের নামমাত্র ও দায়সারা ক্লাসের পর ছেলেটি এখন আগের মতোই বেকার।
এটি কেবল লালমনিরহাটের মজিদ মিয়ার ছেলের একক গল্প নয়, বরং দেশের ৪টি প্রান্তিক জেলার হাজারো হতদরিদ্র ও এতিম তরুণ-তরুণীর সঙ্গে হওয়া এক চরম তামাশার বাস্তব চিত্র। অনগ্রসর ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং এনজিও ‘গ্লোবাল রুরাল এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি’ (জিআরইএস) যৌথভাবে একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তবে হতদরিদ্রদের ভাগ্যবদলের নামে নেওয়া এই প্রকল্পের মূল উপযোগিতাই ভেস্তে গেছে চরম অনিয়ম ও নজিরবিহীন হরিলুটের ফলে।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সরকারের বাসত্মবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চাঞ্চল্যকর সত্য। বাসত্মবায়নকারী কর্মকর্তাদের চরম খামখেয়ালি ও ত্রম্নটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে প্রকল্পটিতে ১ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে সমাজ ও রাষ্ট্রের ফেরত এসেছে মাত্র ৩৬ পয়সা। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রতিটি বিনিয়োগকৃত টাকার বিপরীতে অন্ত্মত ৯ টাকা ৬২ পয়সা আর্থিক সুফল বয়ে আনা, সেখানে প্রকৃত ‘বেনিফিট-কস্ট রেশিও’ বা বিসিআর এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬-এ। অর্থাত্, পুরো প্রকল্পই সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থ অপচয়ের এক ক্লাসিক উদাহরণে পরিণত হয়েছে।
এই হরিলুটের মহোত্সবে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে প্রকল্পের অভ্যন্ত্মরীণ ও বহিরাগত নিরীক্ষায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের অডিটেই এই প্রকল্পের বিপরীতে রেকর্ড ১৯৬টি গুরম্নতর আর্থিক আপত্তি চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি একক প্রকল্পে এত বিপুল সংখ্যক অডিট আপত্তি ওঠার ঘটনা সরকারি উন্নয়ন প্রশাসনের ইতিহাসে বিরল। এই আপত্তিগুলোর গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, ভুয়া প্রশিক্ষক সাজিয়ে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে দৈনিক অতিরিক্ত খাবার বিল ও যাতায়াত ভাতা পকেটে পোরা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে লাখ লাখ টাকার আয়কর কর্তন না করার মতো ভয়াবহ সব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় জালিয়াতির চিত্রটি উন্মোচিত হয়েছে প্রশিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পে প্রশিক্ষক নিয়োগ দিতে হলে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এবং গোপনে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের প্রশিক্ষক দেখিয়ে আট কোটি এগারো লক্ষ ছিয়াশি হাজার ছয়শত টাকা অনিয়মিতভাবে সম্মানী হিসেবে দেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, কোনো ধরনের যোগ্যতার সনদ, আবেদনপত্র বা অভিজ্ঞতার প্রমাণ যাচাই না করেই এই বিপুল টাকা বণ্টন করা হয়েছে, যা সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে জনগণের অর্থ লোপাটের শামিল।
অর্থ অপচয়ের এই ধারা এখানেই থেমে থাকেনি। প্রকল্পের মূল নকশা বা ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফরমা) অনুযায়ী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক সম্মানী ১০০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা ২০০ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও, নথিপত্রে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি টাকা উত্তোলন করে সরকারি আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে প্রায় আশি লক্ষ পয়তালিস্নশ হাজার টাকা। একইভাবে আইটি এবং ড্রাইভিং কোর্সের শিক্ষার্থীদের খাবার বিল বাবদ দৈনিক জনপ্রতি নির্ধারিত ৩২২ টাকা ৫০ পয়সার সীমা লঙ্ঘন করে আরও সাত লক্ষ ঊনত্রিশ হাজার টাকার অতিরিক্ত বিল তুলে আত্মসাত্ করা হয়েছে। এর ওপর বিভিন্ন সরবরাহকারী ও ভেন্ডরদের বিল পরিশোধের সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য করে ২১ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকারও বেশি আয়কর কম কর্তন করা হয়েছে, যা সরকারের সরাসরি রাজস্ব ক্ষতি হিসেবে গণ্য হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থ লোপাটের পাশাপাশি এর মাঠ পর্যায়ের কার্যকারিতা ও লক্ষ্যগোষ্ঠী নির্বাচন নিয়ে উঠেছে আরও বড় প্রশ্ন। এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়ার সময় মূল শর্তই ছিল লালমনিরহাট, জামালপুর, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার ২৫টি উপজেলার চরম অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিমদের স্বাবলম্বী করা। কিন্তু আইএমইডির নিবিড় তদন্ত্ম ও ফোকাস গ্রম্নপ আলোচনায় (এফজিডি) স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন এক চরম বৈষম্যের কথা। প্রকল্পের সুফল পাওয়ার কথা ছিল যাদের, সেই প্রকৃত হতদরিদ্ররা এই প্রশিক্ষণের খবরই জানতে পারেনি। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে এর কোনো প্রচারণাই চালানো হয়নি। উল্টো এনজিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজের নিয়মিত সচ্ছল শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি টাকায় গরিবের হক মেরে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করা হয়েছে।
প্রকল্পের এই ভয়াবহ ব্যর্থতার পেছনে এর ত্রুটিপূর্ণ নকশাকেই প্রধান কারিগর হিসেবে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। একজন সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ তরম্নণকে দক্ষ ড্রাইভার হিসেবে গড়ে তুলতে বা গ্রাফিক ডিজাইন ও আইটি প্রফেশনাল বানাতে যেখানে মাসের পর মাস নিবিড় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার প্রয়োজন, সেখানে এই প্রকল্পে মাত্র ২১ দিনের একটি অতি সংক্ষিপ্ত কোর্স ডিজাইন করা হয়েছিল। ২১ দিনের এই নামকাওয়াসেত্ম প্রশিক্ষণে ড্রাইভিংয়ের মতো সংবেদনশীল পেশার জন্য পর্যাপ্ত প্র্যাকটিক্যাল বা গাড়ি চালানোর সুযোগই পাননি প্রশিক্ষণার্থীরা। কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও ছিল সরঞ্জামের তীব্র সীমাবদ্ধতা।
তার চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হলো, ২১ দিনের এই কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি ডিপিপিতে। এমনকি যারা ড্রাইভিং শিখেছেন, তাদের জন্য সরকারিভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের কোনো সংস্থান ছিল না। বর্তমান শ্রমবাজারে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং আইটি বোর্ডের কোনো স্বীকৃত সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই কাউকেই চাকরি দিতে রাজি হয় না। ফলে, লাইসেন্স আর সনদের অভাবে এই প্রশিক্ষণ নেওয়া যুবকদের একটি বিশাল অংশ চরম হতাশার মধ্যে পতিত হয়েছেন এবং তারা বাধ্য হয়ে আগের মতোই বেকারত্ব কিংবা দিনমজুরির জীবনে ফিরে গেছেন।
আইএমইডির সংগৃহীত পরিসংখ্যান এই চরম ব্যর্থতার চিত্রটিকে আরও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে, ৪টি জেলার ২ হাজার ৬৪০ জন তরম্নণ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু প্রভাব মূল্যায়ন দল যখন মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান চালায়, তখন দেখা যায় এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে বর্তমানে কম্পিউটার সংক্রান্ত্ম পেশায় নিয়োজিত আছেন মাত্র ১২১ জন। একইভাবে ২ হাজার ৫৪৫ জন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিলেও বর্তমানে চালক হিসেবে পেশাগত জীবনে আছেন মাত্র ৭২ জন। অর্থাত্, কয়েক হাজার তরম্নণকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৯৩ জনের। বার্ষিক আয়ের ক্ষেত্রে যেখানে প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল শত কোটি টাকার ওপরে, সেখানে বাসত্মবে অর্জিত হয়েছে তার এক সামান্য ভগ্নাংশ মাত্র।
প্রকল্পের পুরো মেয়াদ শেষে সরকারি অর্থায়নে কেনা সমসত্ম দামী আসবাবপত্র এবং কম্পিউটার সামগ্রী নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) কার্যালয় তথা সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানেও এনজিও ‘জিআরইএস’ তাদের প্রভাব খাটিয়ে ডিপিপির একটি বিতর্কিত ধারাকে ঢাল বানিয়ে সমসত্ম সরকারি সম্পদ নিজেদের সংস্থায় স্থানান্ত্মর করে নিয়েছে, যা নিয়ে অডিট বিভাগ গভীর ক্ষোভ ও তীব্র আপত্তি প্রকাশ করেছে।
আইএমইডির চূড়ান্ত্ম মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি জুন ২০২০ থেকে জুন ২০২২ এর মধ্যে কাগজে-কলমে ১০০ ভাগ ভৌত অগ্রগতি এবং ৯৯.৯৯ শতাংশ আর্থিক ব্যয় নিশ্চিত করলেও, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উপকারিতা অত্যন্ত্ম সীমিত এবং শস্নথ। প্রকল্প পরিচালকদের দেরিতে নিয়োগ করা এবং মাঠ পর্যায়ে কোনো ধরনের কার্যকর তদারকি ও মনিটরিং না রাখাই এই প্রকল্পের অর্থ অপচয়ের পথকে সুগম করেছে।
ভবিষ্যতে দেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নিয়ে এমন কোটি কোটি টাকার ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে আইএমইডি বেশ কিছু কঠোর সুপারিশ করেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের যেকোনো দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণের আগে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট এক্সিট পরিকল্পনা ডিপিপিতে অন্ত্মর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে প্রকল্প শেষ হলেও এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া সুনির্দিষ্ট প্রচারণা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত হতদরিদ্রদের নির্বাচন করা, প্রশিক্ষণের মেয়াদ যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ও বোর্ডের সরকারি সনদপ্রাপ্তি শুরম্নতেই নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায়, হতদরিদ্রের দারিদ্র্য বিমোচনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সরকারি তহবিলের কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়ার এই সংস্কৃতি কোনোদিনই বন্ধ হবে না।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.