August 11, 2026, 9:33 pm
শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারাকে দেশের জন্য বড় ধরনের ‘সিস্টেম লস’ বা ব্যবস্থাগত ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস হলে তা কোনো না কোনোভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও শিক্ষাব্যবস্থার সিস্টেম লস জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ শিক্ষার সুযোগ থেকে ঝরে পড়া জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত করতে না পারলে তারা দেশের সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হতে পারে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ‘এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: নীতি, অংশীদারিত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও এসডিজি অর্জন’ শীর্ষক সমান্তরাল অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে সিস্টেম লসের কথা শোনা যেত, এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও সেই সিস্টেম লস দেখা যাচ্ছে। পঞ্চম শ্রেণির পর অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে আর ভর্তি হচ্ছে না। আবার দশম শ্রেণিতে এসএসসি পরীক্ষার পর অনেকে এইচএসসিতে ভর্তি হচ্ছে না। এইচএসসির পরও অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। এটিই তার কাছে শিক্ষাব্যবস্থার বড় সিস্টেম লস।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেম লস কোনোভাবে পুনরুদ্ধার করা গেলেও শিক্ষা খাতের সিস্টেম লস অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে ভবিষ্যতে তারা দেশের জন্য সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হতে পারে। যাদের দেশের জন্য জনমিতিক সুবিধা বা উন্নয়নের সুফল বয়ে আনার কথা, তারাই একসময় রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এসডিজি অর্জনে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। দেশে শিক্ষিত ও গ্র্যাজুয়েট মানুষের অভাব নেই, কিন্তু তাদের কীভাবে দেশের অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রয়েছে। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, গবেষণা করেছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন। কিন্তু শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না, সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কীভাবে দক্ষ, উৎপাদনশীল ও কর্মক্ষম মানবসম্পদে পরিণত করা যায়, সেটিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এহসানুল হক মিলন। তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করলেও তাদের একটি অংশকে বিদেশে গিয়ে নিম্নদক্ষতার কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে। একজন গ্র্যাজুয়েট কেন ক্লিনারের কাজ করবেন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বর্তমানে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রবাসী আয়কে দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘রক্তপ্রবাহের’ মতো। এ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি ও ম্যান্ডারিনসহ বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে না পারলে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে ধরনের কার্যকর সংযোগ থাকা প্রয়োজন, তা এখনো যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে নীতিগত আলোচনা ও কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চলতি বছর পুরো শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও তা পরিমার্জন করা হয়েছে। চারটি নতুন বই দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, আসক্তি এবং পরিবর্তিত সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু পুরোনো কাঠামো ধরে রেখে ভবিষ্যতের মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব নয়।
নারী শিক্ষার অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ছে। এটিকে তিনি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখেন। নারী শিক্ষার প্রসার এবং নারীর ক্ষমতায়ন দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষক সংকটকে শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ১০ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। এছাড়া ৭৭ হাজার শিক্ষক এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও ৮ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষক ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগ দিতে গেলেই নানা ধরনের মামলা ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা ও দীর্ঘদিনের ঘাটতি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হচ্ছে। তবে সমালোচকদের সমালোচনা করার পাশাপাশি গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানান তিনি।
এহসানুল হক মিলন বলেন, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শিক্ষার উন্নয়ন হবে না। স্কুলের ভবনের ভেতরে প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীদের যথাযথ লেখাপড়া হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করছে কি না সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না, সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল পেতে হলে তা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।
সবশেষে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে না দেখে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার সিস্টেম লস কমিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে দক্ষ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত করাই হবে দেশের টেকসই উন্নয়ন ও এসডিজি অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত।
ইএটি
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.