May 31, 2026, 8:00 am

মিরসরাইয়ে সামরিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করবে সরকার-বিডা চেয়ারম্যান

মিরসরাইয়ে সামরিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করবে সরকার-বিডা চেয়ারম্যান

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন) গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছে সরকার। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে আগে প্রসত্মাবিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত প্রায় ৮৫০ একর জমিকে এখন ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হিসেবে মাস্টার পস্ন্যানে অন্ত্মর্ভুক্ত করা হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত্ম নেওয়া হয়েছে।

  •  দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন হচ্ছে আনোয়ারায়
    দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ইউরোপে বিডার কার্যালয় খোলা হবে
    প্রবাসীরা বিনিয়োগ আনতে পারলে ১.২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হবে
    পৌরসভা এলাকাও ইকোনমিক জোন গঠনের অনুমতি দেয়া হবে
    বিডা, বেজা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষসহ ছয়টি সংস্থা একীভূত হবে

সোমবার রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। এসময় প্রধান উপদেষ্টা প্রেসসচিক শফিকুল আলম বিভিন্নপ্রশ্নের উত্তর দেন। আশিক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সামরিক শিল্প এখন দ্রম্নত বর্ধনশীল একটি খাত। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু ক্যাপটিভ উত্পাদন সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত্ম জরম্নরি হয়ে পড়েছে। সামপ্রতিক যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ঘাটতি তৈরি হয়েছে মূলত গোলাবারম্নদ ও সাধারণ যন্ত্রাংশ্তেউচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্রে নয়। এই বাসত্মবতায় বাংলাদেশ প্রযুক্তি স্থানান্ত্মর, যৌথ বিনিয়োগ এবং সরবরাহকারী দেশ হিসেবে এই খাতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বেজা চেয়ারম্যান জানান, মিরসরাইয়ের এই জমিটি আগে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ছিল। তবে প্রকল্পটি বাতিল হওয়ায় জমিটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহূত অবস্থায় ছিল। এখন সেটিকে পুনঃব্যবহার করে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত্ম নেওয়া হয়েছে। এটি বেজার মাস্টার পস্ন্যানে অন্ত্মর্ভুক্ত করা হবে এবং ভবিষ্যতে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সামগ্রিক পরিকল্পনায় এই জোনের অবস্থান স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত্ম শুধু সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের বড় সম্ভাবনা। আশিক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক বাজারে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি এই খাতে অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দেশের শিল্পখাতে নতুন একটি ডাইভারসিফিকেশন তৈরি হবে।

এই সভায় আরও একাধিক গুরম্নত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত্ম নেওয়া হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত্ম হচ্ছে দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন গঠনের উদ্যোগ। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারাকে এই ফ্রি ট্রেড জোনের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমির ওপর এই জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিডা চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ফ্রি ট্রেড জোনের কোনো কাঠামো নেই। ফ্রি ট্রেড জোন বলতে এমন একটি এলাকা বোঝানো হয়, যা কার্যত ওভারসিজ টেরিটরির মতো কাজ করে। সেখানে কাস্টমসের বাধ্যবাধকতা থাকবে না, পণ্য সংরক্ষণ, উত্পাদন ও পুনঃরপ্তানির সুযোগ থাকবে। এতে বাংলাদেশের ‘টাইম টু মার্কেট’ সমস্যার বড় একটি সমাধান আসতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ দূরবর্তী বাজার থেকে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে দীর্ঘ সময় লাগায় বাংলাদেশের পোশাক খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা কোনো ফ্রি ট্রেড জোনে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ বা অন্য দেশে তা দ্রম্নত পুনঃরপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি আসবে এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক উত্পাদন চেইনে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারবে।

বেজার গভর্নিং বোর্ড সভায় কুষ্টিয়া চিনিকল পুনরম্নজ্জীবনের নীতিগত সিদ্ধান্ত্মও নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান গ্যাস, বিদ্যুত্ ও সড়ক অবকাঠামো ব্যবহার করে সেখানে একটি কার্যকর শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ২০০ একর জমিকে অধিকতর উত্পাদনশীলভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটি গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া পৌরসভা এলাকার ভেতরে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত্ম নেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালের আইনে পৌরসভাগুলো বেজার আওতার বাইরে ছিল। তবে পৌরসভার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাইরে অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে গেলে কৃষিজমি অধিগ্রহণের চাপ বাড়ছে। তাই পৌরসভার ভেতরে থাকা বন্ধ ও অকার্যকর শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরম্নজ্জীবিত করতেই এই নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনতে নতুন প্রণোদনা স্কিমের নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছে বিডার গভর্নিং বোর্ড। এই স্কিম অনুযায়ী, প্রবাসীরা বাংলাদেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনলে সেই বিনিয়োগের ১ দশমিক ২৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, কেউ যদি ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনেন, তাহলে সরকার থেকে তিনি ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার প্রণোদনা পাবেন।

একই সঙ্গে বিডা, বেজা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, বিসিক, পিপিপি অথরিটিসহ ছয়টি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত্ম পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ কনসালট্যান্ট দিয়ে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হবে, যাতে কোনো সংস্থা অতিরিক্ত সুবিধা না পায় এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয়।

আশিক চৌধুরী বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভালো উদ্যোগ থেমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই এসব সিদ্ধান্ত্মকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে টেকসই করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যত্ সরকারগুলোও এগুলো বাসত্মবায়ন অব্যাহত রাখতে বাধ্য থাকে। তাঁর মতে, মিরসরাইয়ে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনসহ এই নীতিগত সিদ্ধান্ত্মগুলো বাসত্মবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্প ও বিনিয়োগ কাঠামোতে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com