July 10, 2026, 11:13 pm

থার্মেক্সকে অনিয়মের ঋণেও বিশেষ সুবিধা দিতে মরিয়া রুপালী ব্যাংক

থার্মেক্সকে অনিয়মের ঋণেও বিশেষ সুবিধা দিতে মরিয়া রুপালী ব্যাংক

মোস্তাফিজুর রহমান :  রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি থার্মেক্স গ্রুপ। বাধ্য হয়ে বিদেশি মুদ্রার ঋণটিকে ফোর্সড লোনে রূপান্তর করে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। সময়সমত ঋণগুলো ফেরত না দেওয়ায় রূপালী ব্যাংকে ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ে গ্রুপটি। এখানেই শেষ নয়। সেই ঋণ বিশেষ বিবেচনায় পুন:তফসিল করে দায় পরিশোধের সময় বৃদ্ধি করেছে রূপালী।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানিকারকদের সহায়তায় গঠন করা হয়েছিল এক্সপোর্ট ডেভলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ)। এই ফান্ডের আকার বাড়তে বাড়তে ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও আইএমএফ-এর চাপে তা কমিয়ে ৪ দশমিক ১০ বিলিয়নে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু যারা এই ফান্ড থেকে ঋণ নিয়েছে তাদের অনেকেই ফেরত দিতে পারছে না মার্কিনি মুদ্রায় নেওয়া এসব ঋণ। এতে করে বিপাকে পড়েছে রূপালীসহ আরও কিছু ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ থেকে গঠিত ইডিএফ থেকে থার্মেক্স গ্রুপকে ৬৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলেও তা শোধ দিতে পারেনি গ্রুপটি। বাধ্য হয়ে থার্মেক্স গ্রুপের নামে সুদে আসলে মোট ৭১ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ফোর্সড লোন সৃষ্টি করেছে রূপালী ব্যাংক। এখন মাসিক কিস্তিতে আগামী ছয় মাসে এই পরিশোধের আবেদন করেছে থার্মেক্স। তার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি চেয়েছে রূপালী ব্যাংক। কিন্তু সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি এই ৭১ কোটি ৭৩ লাখ এবং থার্মেক্স গ্রুপের অপর সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিস্টার ডেনিম কম্পোসিট লি. এর নামে নেওয়া ১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালের মধ্যে দিতে না পারলে মন্দমানে খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। কারণ এই ঋণগুলো সৃষ্টির মাধ্যমে রূপালী ব্যাংকের একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করেছে থার্মেক্স। অর্থাৎ মূলধনের ২৫ শতাংশ (ফান্ডেড-ননফান্ডেড) অতিক্রম করেছে।

বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে রূপালী ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বা মূলধন ছিল ২ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। বিধিমতে কোনো একক গ্রাহক বা গ্রুপকে ৫৫৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই রূপালী ব্যাংকের। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে থার্মেক্স গ্রুপের মোট ঋণ রূপালী ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ গ্রুপটি রূপালী ব্যাংকের একটি বৃহৎ গ্রাহক। কিন্তু বার্ষিক প্রতিবেদনে বৃহৎ গ্রাহকের তালিকায় নাম নেই থার্মেক্সের। ৩৬৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া গ্রাহক নোমান স্পিনিং মিলস লি. এর নাম বৃহৎ গ্রাহকের তালিকায় থাকলেও কেন থার্মেক্সের নাম নেই এমন প্রশ্ন থেকেই যাই।

বিশ্বস্থ সূত্র জানায়, রূপালী ব্যাংক থেকে থার্মেক্স গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার আশেপাশে ছিল। কিন্তু এতোদিন একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করেনি। নতুন করে ৮৩ কোটি ৭৯ লাখ (৬৬.২৭+১৭.৫২) টাকা যুক্ত হয়ে ঋণের সমষ্টি একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী যা অন্যায়।

ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকের মূলধন সরকার কর্তৃক দেওয়া মূলধন পুনর্ভরণের অর্থ ও স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়ার মাধ্যমে ক্রমাগত বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৪৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল ২ হাজার ২২৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। নূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন (এমসিআর) ৪ হাজার ৫১৯ কোটি। মূলধন ঘাটতি ২ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানার রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেয়া হলে দেখেও তিনি কোন জবাব দেননি।

উল্লেখ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে ১৯৮৯ সালে গঠন করা হয় ইডিএফ, যা থেকে কাঁচামাল আমদানির জন্য উদ্যোক্তাদের ডলারে ঋণ দেওয়া হয়। একাধিক ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গত বছরের এপ্রিলে ডলার–সংকট শুরু হওয়ার পর ইডিএফ ঋণে সুদহার বাড়ানো হয়। এরপর চলতি বছরের মার্চে নানা নিয়মকানুন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ইডিএফের আকার ধীরে ধীরে কমছে। ইডিএফের ঋণ ৭ বিলিয়ন বা ৭০০ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ৪১০ কোটি ডলার। ইডিএফ–সুবিধা ধীরে ধীরে বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কারণ, ইডিএফের ঋণকে আর রিজার্ভের হিসাবে দেখানো যাচ্ছে না। আবার রিজার্ভ বাড়াতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৩ দশমিক ০৩ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৩০৬ কোটি ডলার।

পণ্য রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানিতে ইডিএফ থেকে ঋণ দেওয়া হয়। এই ঋণ ফেরত দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন সময় নিতে পারেন উদ্যোক্তারা। জানা গেছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ও রূপালীসহ বেসরকারি খাতের একাধিক ব্যাংকের গ্রাহকেরা ঋণ নিলেও তা ফেরত দিচ্ছেন না।

রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও রপ্তানিকারকদের উৎপাদনে সহায়তা দিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে ১৯৮৯ সালে গঠন করা হয় ইডিএফ। গত জানুয়ারি মাসে ঋণের সুদহার সাড়ে ৪ শতাংশ করা হয়, আর অনাদায়ি অর্থের ওপর অতিরিক্ত ৪ শতাংশ দণ্ডসুদ আরোপ করা হয়। এখন পর্যন্ত ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়েছে ৪৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

এদিকে ইডিএফের বিকল্প হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানিসহায়ক তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে জনতা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এই তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে টাকা নিয়ে রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারছেন রপ্তানিকারকেরা। যদিও কাঁচামালের বড় অংশই ব্যয় হয় ডলারে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্যরা ইডিএফ থেকে দুই কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। আগে একসময় এই ঋণের সীমা ছিল ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ডাইড ইয়ার্ন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিওয়াইইএ) সদস্যরা ঋণ নিতে পারেন সর্বোচ্চ ১ কোটি ডলার। আগে তাঁদের ঋণের সীমা ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

ব্যবসায়ী আবদুল কাদির মোল্লা পোশাক ও বস্ত্র খাতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থার্মেক্স গ্রুপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই বৃহৎ শিল্প গ্রুপে থার্মেক্স টেক্সটাইল মিলস, থার্মেক্স স্পিনিং, থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন, থার্মেক্স ইয়ার্ন ডাইং, থার্মেক্স ওভেন ডাইং, আদুরি অ্যাপারেলস, আদুরি নিট কম্পোজিটসহ আন্তর্জাতিক মানসম্মত ১৬টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান আছে। বর্তমানে তিনি বেসরকারি খাতের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংকের একজন পরিচালক। রূপালী ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার কল এবং এসএমএস করেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র বলেন, কোনো ব্যাংক যদি আইন লঙ্ঘন করে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চয় তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর ইডিএফ-এর ঋণ খেলাপি হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ নির্ধারিত সময় শেষে ব্যাংকের একাউন্ট থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই টাকা কেটে নেয়। এখন কোনো ব্যাংক যদি অন্যায়ভাবে ফোর্সড লোন তৈরি করে, সেই ঋণ খেলপি হয়ে যায় এবং নীতিবহির্ভূতভাবে পুন:তফসিল করে তাহলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিজনেস নিউজ/এমআর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com