July 10, 2026, 11:13 pm

অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা উধাও

অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা উধাও

ব্যাংক খাতের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবরের মধ্যে এবার সামনে এসেছে অগ্রণী ব্যাংকের একটি শাখার ভল্ট থেকে টাকা সরানো এবং আরেক শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। এসব ঘটনায় বিশেষ করে ব্যাংকের ভল্টের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আত্মসাৎ, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি সংক্রান্ত ঘটনার ওপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাসিক (জুলাই) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, গত জুলাই মাসে ঢাকায় অগ্রণী ব্যাংকের কামরাঙ্গীরচর শাখার ভল্ট থেকে টাকা চুরি হয়। ওই কাজে জড়িত ছিলেন শাখার দুই কর্মকর্তা। তাদের কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত টাকা আদায় করা গেলেও ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত জুলাইয়ে অগ্রণী ব্যাংকের কামরাঙ্গীরচর শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. নূর-এ-আলম মুক্তাদির ও প্রিন্সিপাল অফিসার মো. হাবিব সরকার মিলে শাখার ভল্ট থেকে ৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরে শাখার পক্ষ থেকে ২৫ জুলাই একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। তবে তাদের কাছ থেকে সেই টাকা আদায় করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন অন্য কর্মকর্তারা।

বিষয়টি স্বীকার করে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুরশেদুল কবীর বলেন, ‘জাল-জালিয়াতি বা অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে অগ্রণী ব্যাংক। আমরা ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।’

অন্যদিকে অগ্রণী ব্যাংকেরই গাজীপুর করপোরেট শাখায় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ১ কোটি ৩৯ লাখ ২৭ হাজার ৮০৫ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আবু তাহের এবং প্রিন্সিপাল অফিসার কাজী তৌহিদুল ইসলাম। ই-জিপি সিস্টেমে টেন্ডার সিকিউরিটি ও পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ইস্যুতে তারা এ জালিয়াতি করেছেন। পরে শাখার পক্ষ থেকে ১৮ জুলাই এ বিষয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ বিষয়ে এখনও কোনো তদন্ত হয়নি। কমিটি গঠন করার পর তদন্তের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ভল্ট থেকে টাকা গায়েব হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের আকস্মিক পরিদর্শনে বেরিয়ে এসেছিল ইউনিয়ন ব্যাংকের ভল্টে ১৯ কোটি টাকা গরমিলের তথ্য। শাখাটির কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে ভল্টে ৩১ কোটি টাকা রয়েছে। কিন্তু পরিদর্শক দল গুনে পেয়েছিল ১২ কোটি টাকা। ওই ঘটনায় ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। একটি তদন্ত কমিটিও করা হয় সে সময়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দলের উপস্থিতিতেই ১৯ কোটি টাকার হিসাব সমন্বয় করা হয়েছিল।

অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১০ সাল শেষে অগ্রণী ব্যাংকের মোট সম্পদ ছিল ২৬ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। এক যুগ পর ২০২২ সাল শেষে ব্যাংকটির সম্পদের আকার ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবে গত এক যুগে ব্যাংকটির সম্পদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৩৫ শতাংশ। সম্পদের আকার চারগুণ বাড়লেও ব্যাংকটির মুনাফা কমেছে। ২০১০ সালে অগ্রণী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৩৫১ কোটি টাকা। আর গত বছর ব্যাংকটি মাত্র ১৪১ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখাতে পেরেছে। যদিও এ মুনাফা দেখানো হয়েছে কৃত্রিমভাবে।

২০২২ সাল শেষে ৫ হাজার ৯১১ কোটি টাকার প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতিতে ছিল অগ্রণী ব্যাংক। আইন অনুযায়ী সঞ্চিতি ঘাটতিতে থাকলে কোনো ব্যাংকের নিট মুনাফা দেখানোর সুযোগ নেই। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নীতি ছাড় নেওয়া হয়েছে। আগামী চার বছরে ব্যাংকটিকে ঘাটতি থাকা সঞ্চিতি পূরণের শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে ব্যাংকটি নিট মুনাফা দেখিয়ে নিজেদের আর্থিক অবস্থা ভালো দেখাতে চেয়েছে।

শুধু নিট মুনাফা পরিস্থিতিই নয়, বরং গত এক যুগে ব্যাংকটির আর্থিক ভিতও দুর্বল হয়ে উঠেছে। ২০২২ সাল শেষে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বিতরণকৃত ঋণের ২১ দশমিক ১১ শতাংশই এখন খেলাপি। এর বাইরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকটি। যদিও এক যুগ আগে ২০১০ সালে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ১০২ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

গত বছর শেষে অগ্রণী ব্যাংক ২ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকটির ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার (সিআরএআর) ন্যূনতম সাড়ে ১২ শতাংশ হওয়ার কথা। যদিও এক্ষেত্রে ব্যাংকটির সিআরএআর রয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। অথচ এক যুগ আগে সঞ্চিতি সংরক্ষণ ও মূলধনের দিক থেকে বেশ স্বাবলম্বী ছিল অগ্রণী ব্যাংক

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com