July 11, 2026, 8:54 am

প্রনোদনা প্যাকেজের ৫০ হাজার কোটি টাকা এখনও বিতরণই হয়নি

প্রনোদনা প্যাকেজের ৫০ হাজার কোটি টাকা এখনও বিতরণই হয়নি

কভিড-১৯-এ ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ২১টি প্যাকেজের মাধ্যমে ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার ঋণ, নগদ অর্থ ও খাদ্যসহায়তার ঘোষণা করেছে। তবে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ৫০ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা বিতরণ সম্ভব হয়নি, যা মোট অর্থের প্রায় ৪২ শতাংশ।

প্রণোদনা প্যাকেজের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও মন্ত্রণালয়কে শতভাগ অর্থ বিতরণের জন্য অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ডিসেম্বর নাগাদ বিতরণ সম্ভব হয়েছে ৭০ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অর্থ বিভাগের ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের অগ্রগতি শীর্ষক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। ১ হাজার ৯৯২ পোশাক কারখানার ৩৫ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীকে এ তহবিলের প্রায় পুরো অর্থাৎ ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে ঋণের জন্য উদ্যোক্তাদের মাত্র ২ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হবে।

এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৫৪৯টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২৮ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়েছে। আর বিতরণ বাকি রয়েছে ১১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। দেশের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিচ্ছে। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা সুদ প্রদান করবে সাড়ে ৪ শতাংশ আর বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে সরকার।

পাশাপাশি মাইক্রো ও কুটির শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ তহবিল থেকে ১০ হাজার ৮২৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। বাকি আছে ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। দেশের ৭৬টি ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৯ শতাংশ সুদে এ ঋণ পরিশোধ করছে। এক্ষেত্রে গ্রাহককে সুদ দিতে হবে ৪ শতাংশ আরা বাকি ৫ শতাংশ সরকার সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে।

অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার সম্প্রতি প্রণোদনা বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত এক সেমিনারে বলেন, সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব প্রণোদনা প্যাকেজ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বেশকিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ার জটিলতা ও ব্যাংকগুলোর আগ্রহ না থাকার কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে এরই মধ্যে এসব জটিলতা কটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আগামীতে প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়নে গতি আসবে।

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রফতানি খাতে সহায়তার জন্য এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে (ইডিএফ) ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এ তহবিলের আওতায় সুদের হার কমিয়ে ভ্যারিয়েবল রেটের পরিবর্তে গত এপ্রিল মাসে ২ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে অক্টোবর মাসে তা আরো কমিয়ে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশে ৫৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এ প্যাকেজ বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত।

এদিকে রফতানি খাতের আরেক প্রণোদনা প্যাকেজ প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রি-ফাইন্যান্সিংয়ের ৫ হাজার কোটি টাকার স্কিম থেকে ৪ হাজার ৮৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকাই বিতরণ সম্ভব হয়নি। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ১২১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ কর্মসূচির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো কর্তৃক গৃহীত পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার ওপর ৩ শতাংশ হারে সুদ আরোপ হবে। আর এ তহবিল থেকে গ্রাহক পর্যায়ে সুদহার হবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সরাসরি সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার-নার্স ও চিকিৎসাকর্মীদের দুই মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ সম্মানী প্রণোদনা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। এ খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও কোনো অর্থ বিতরণ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুবিধাভোগী চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সুবিধাভোগী চিহ্নিত প্রক্রিয়া শেষ হলেই এ অর্থ দেয়া হবে।

এছাড়া নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানে সরাসরি নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ ভাইরাসের প্রাদর্ভাব নিয়ন্ত্রণে লকডাউন ও সরকার ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিয়োজিত মাঠ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালনকালে করোনায় আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বরাদ্দ থেকে মাত্র সাড়ে ২৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের পরিবারকে দেয়া হয়েছে।

করোনায় কর্মহীন দরিদ্র মানুষকে খাদ্যসহায়তা দিতে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে- আরো ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা বিতরণ বাকি আছে। এ প্যাকেজের আওতায় ৫ লাখ টন চাল এবং এক লাখ টন গম বিতরণ করা হয়েছে।

এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণের জন্য ৭৭০ কোটি টাকা প্রণোদনার পুরোটাই ব্যয় হয়েছে। এতে ১৮ লাখ গরিব মানুষ উপকৃত হয়েছেে। ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৫০ হাজার টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৫২৯ কোটি টাকা। পাশাপশি শহরাঞ্চলে বিশেষ ওএমএসের আওতায় অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এতে সরকারের ২৪১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

আর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ আড়াই হাজার টাকা দেয়ার জন্য ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার প্যাকেজ দেয়া হয়। সর্বশেষ তথ্যমতে ৩৭৮ কোটি ৪২ টাকা বিতরণ করা হয়নি। তবে মাঠ পর্যায়ে ৮৭৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা প্রায় ৩৫ লাখ গরিব মানুষকে দেয়া হয়েছে।

বিদেশফেরত প্রবাসী শ্রমিক, প্রশিক্ষিত তরুণ এবং বেকার যুবকদের গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া করোনার নেতিবাচক প্রভাবের কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ১১২টি উপেজলায় শতভাগ বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের এর আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ প্যাকেজে ৮১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২৩ কোটি টাকা। বিতরণ বাকি আছে ৭৯২ কোটি টাকা।

গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ করে দেয়া কর্মসূচির আওতায় ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। আর বিতরণ সম্ভব হয়নি ৯১৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ৮৬০ কোটি টাকার ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যে বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে চালকল মালিকরা সরকারকে চাল না দেয়ায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আর কৃষিকাজ যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে ১৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা বিতরণ হয়েছে। বাকি টাকা দিয়ে তিন বছর মেয়াদি এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নাধীন।

সার ও বীজের জন্য ভর্তুকি ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনাকালে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। এছাড়া শস্য ও ফসল চাষের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি রিফাইন্যান্সিং স্কিম থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এ প্যাকেজ থেকে কৃষক ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন। বাকি ৫ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে।

এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৩ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার একটি স্কিম ঘোষণা দিয়েছে। এ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা হয় ১ হাজার ১২৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। এদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের সুদ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এজন্য ২ হাজার কোটি টাকা সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে ব্যাংকগুলোকে দেবে। এ প্যাকেজের আওতায় ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও সরকার যৌথভাবে দেড় হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে পুরোটাই বিতরণ করা হয়। চিহ্নিত বেকার শ্রমিকরা তিন মাস নগদ সহায়তা হিসেবে ৩ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে দেয়া হয়। এছাড়া মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প ঋণের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের ২ হাজার কোটি টাকা থেকে এখন পর্যন্ত এক টাকাও ছাড় হয়নি।

এদিকে সম্প্রতি ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার দুটি নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এ দুই প্যাকেজের বাস্তবায়ন এখনো সেভাবে শুরু হয়নি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরো ১০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে এ ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এখন সব থেকে ভালো হতো যারা চাকরি হারিয়েছে তাদের হাতে যদি কিছু টাকা দেয়া যেত। এতে অর্থনীতিতে গতি আসত। প্রণোদনা প্যাকেজগুলো ভালোভাবে বাস্তবায়ন হলেই অর্থনীতি অনেকটা চাঙ্গা হতো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসএমই খাতকে প্রচুর পরিমাণ সহযোগিতা করতে হবে। তাহলে মানুষের হাতে কিছু টাকা যাবে। কারণ এখন পেছানোর সময় নয়।

বিজনেস নিউজ/এমআরএম

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com