April 30, 2026, 5:29 am

মানুষ কষ্ট করে উন্নতি করলেও, বৈষম্যের কারণে দারিদ্রতা বাড়ছে

মানুষ কষ্ট করে উন্নতি করলেও, বৈষম্যের কারণে দারিদ্রতা বাড়ছে

মানুষ কষ্ট করে বেয়ে বেয়ে উপরে উঠলেও, বৈষম্যের কারণে দারিদ্রতা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

আজ সোমবার (২১ ডিসেম্বর) জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) আয়োজিত বার্ষিক মানব উন্নয়ন সূচক প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দারিদ্র দূরীকরণ একইসঙ্গে অন্যায় দূরীকরণ করতে হচ্ছে সরকারকে। কারণ, অসাম্য অগ্রহণযোগ্য। এটা মানুষের তৈরি অসাম্য বা বৈষম্য। যা আমাদের দেশে গেড়ে বসে আছে, এজন্য অনেক বড় একটা অংশ দারিদ্রে ভুগছে।

তিনি বলেন, মজার ব্যাপার হলো, এই অন্যায়ের অনুকূলে আইন আছে। আমরা এগুলো সরাতে পারছি না। আমাদের সরকার এগুলো সরাতে চায় কিন্তু কোন এক প্রভাবশালী মহলের কারণে সরকার এটা সরাতে পারছে না।

অভ্যন্তরীণ শক্তি আছে, তারা এই অন্যায়ের উপর টিকে আছে। তাদের জন্য এটা তাড়াতাড়ি সরানো যাচ্ছে না। এসব বেআইনিভাবে কিছু নিয়মের কারণে মানুষ দরিদ্র হচ্ছে, বৈষম্য বাড়ছে। এসব সরানোর জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চলবে, যোগ করেন মন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, ইউএনডিপি প্রতি বছর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আমাদের দেশের জন্য প্রতিবেদন দারুণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রতিবেদন নিয়ে মোটামোটি জনগণ উৎসুক। সার্বিকভাবে মোটাদাগে আমরা ভালো করেছি। তবে এটা নিয়ে কিছু মানুষের সংশয় আছে, কারোর সংশয় নিয়ে আমরা চিন্তিত নয়। আরো উন্নয়ন করার খাত আছে। গত ১০-১২ বছর যিনি দেশ পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী। উনার(প্রধানমন্ত্রী) অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। গত ১২ বছরে তার কৌশলে দেশ সোনার বাংলায় পরিণত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সকল কৌশল ঠিক ছিল। তবে এই বছর ২০২০ সাল নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, সারা বিশ্বের মানুষ দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে আমরা চিন্তিত। পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব এর অন্যতম কারণ।আমাদের সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় নানা পদেক্ষপ নিয়েছে। পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাবে বাংলাদেশ দায়ি নয়। তারপরও বাংলাদেশ নানা দুর্যোগের মধ্যে পড়ছে।’

এম এ মান্নান বলেন, নিজের মায়ের রক্ত খেয়ে যেমন বাচ্চা বাড়ে, ঠিক তেমনি প্রকৃতিকে খেয়েও আমরা মানবজাতি বেড়েছি। সুতরাং আমাদের মধ্যে সচেতনতা এসেছে যে, মাকেও বা প্রকৃতিকেও রক্ষা করতে হবে। সেদিকেও আমাদের নজর ঘুরাচ্ছি। আমাদের বাংলাদেশে সেই বিশাল লীলা বা খেলা সারাবিশ্বে যা হচ্ছে আমাদের দেশেও তার একটা অংশ হচ্ছে। আমাদের সরকার ও জনগণ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বা কাছাকাছি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

মানব উন্নয়ন সূচকের মাধ্যমে মূলত একটি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনযাত্রার সামগ্রিক অবস্থা পরিমাপ করা হয়, তবে এবার মানব উন্নয়ন সমীক্ষা প্রবর্তনের ৩০ তম বার্ষিকীতে দুটি বিষয় নতুন ভাবে যুক্ত করা হয়েছে- কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা (carbon dioxide emissions) ও মোট ব্যবহৃত সম্পদের পরিমাণ (material footprint)।

এই সমন্বিত পদ্ধতি থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মানুষ ও পরিবেশ উভয়ের কল্যানের উপর ভিত্তি করে মানব উন্নয়নকে চিন্তা করলে সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। যেমন এ বছর ৫০টিরও বেশি দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অধিক নির্ভরশীলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে রাঙ্কিং এর শীর্ষস্থান থেকে ছিটকে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমীক্ষাটি প্রকাশের সময় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান আকিম স্টেইনার বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি দেশই পরিবেশেকে ধ্বংস করে মানব উন্নয়নে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। তবে প্রথম প্রজন্ম হিসেবে আমরা এই ভুল সংশোধনে এগিয়ে আসতে পারি। এটিই হওয়া উচিত মানব উন্নয়নের পরবর্তি পদক্ষেপ।

ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদিপ্ত মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ অতিমারিতে এখনো পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও প্রাণহানির পাশাপাশি অতিমারী জনিত সামগ্রিক প্রভাব আরও অনেক বিস্তৃত ও প্রকট। বহু পরিবার জীবিকা হারিয়ে দারিদ্র সীমানার নিচে নেমে গেছে, আয় অসমতা (income inequality) বেড়েছে এবং লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা (gender based violence) বেড়েছে, এবং লেখাপড়া থেকে দীর্ঘ বিরতির কারণে ছাত্রছাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর মানুষের বিরূপ আচরণকে আমলে নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই এরকম একটি অতিমারীর আশঙ্কা করছিলেন। এই সমীক্ষাটি আমাদেরকে দেখিয়েছে যে পরিবেশ সম্মত উপায়ে উন্নয়ন পরিচালনা করা অর্থ মানুষ বা প্রকৃতির মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নেওয়া নয়, বরং একটি সমন্বিত কৌশল অবলম্বন করা।

এবার মানব উন্নয়েনর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন আরেকটু বেড়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) বার্ষিক মানব উন্নয়ন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২০ অনুযায়ী, ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম, যা গত বছর ছিল ১৩৫তম।

গত ১৫ ডিসেম্বর বৈশ্বিক এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। আজ প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তালিকার শীর্ষস্থানে রয়েছে নরওয়ে। এরপরই রয়েছে আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হংকং ও আইসল্যান্ড।

মানব উন্নয়ন সূচকে এবার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের আগে রয়েছে দুটি দেশ- ভুটান ও ভারত। এ অঞ্চলে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ভুটানের অবস্থান ১২৯ নম্বরে। ভারত রয়েছে ১৩১ নম্বরে। তবে আগের বছরের তুলনায় এবার ভারত পিছিয়েছে। এর আগের বছর তালিকায় ভারতের অবস্থান ছিল ১২৯তম। এ ছাড়া নেপাল ১৪২ ও পাকিস্তান ১৫৪ নম্বরে রয়েছে।

প্রতিটি দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও সম্পদের উৎস বৈষম্য, লিঙ্গ সমতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা বাণিজ্য ও আর্থিক প্রবাহ যোগাযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ও জনমিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সূচক তৈরি করে ইউএনডিপি। এসব মানদণ্ড মিলিয়ে এবার বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন স্কোর দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৬৩২, যা গতবার ছিল শূন্য দশমিক ৬১৪।

ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে জন্ম নেওয়া ভারতীয়দের গড় আয়ু ৬৯.৭ বছর যা বাংলাদেশের (৭২.৬ বছর) থেকে কম। তবে তা পাকিস্তানে (৬৭.৩ বছর) আরও কম।

১৯৯০ সাল থেকে সারাবিশ্বে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে ইউএনডিপি। যে দেশ মানব উন্নয়ন সূচকে যত এগিয়ে সে দেশ তত উন্নত বলে ধরা হয়।

বিজনেস নিউজ/এমআরএম

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com