May 25, 2026, 5:00 am

প্রতারণার ঋণে প্রবৃদ্ধির জোরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের আইপিওতে অ্যান্ট

প্রতারণার ঋণে প্রবৃদ্ধির জোরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের আইপিওতে অ্যান্ট

চীনা কোম্পানি আলিবাবার সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যান্ট গ্রুপ পুঁজিবাজারে আইপি ছেড়ে যাবতকালের সর্বোচ্চ তহবিল ৩০ বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে ঋণ ব্যবসার দ্রুত প্রবৃদ্ধিকে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে।

এই ঋণ বাণিজ্যের উৎস হলো অ্যান্ট গ্রুপের মালিকানাধীন আলিপে। জ্যাক মা প্রতিষ্ঠিত এই ডিজিটাল পেমেন্ট প্লাটফর্ম এতো বিশাল যে চীনের বন্ধকবিহীন ভোক্তা ঋণের ১০ ভাগের একভাগ এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়।

লন্ডনভিত্তিক সোয়াশ বছরের পুরনো গণমাধ্যম ফাইন্যানশিয়াল টাইমস বলছে, মোবাইল ও ইন্টারনেটভিত্তিক প্লাটফর্মটি এমন প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করছে, যাতে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স থেকে অর্থ না কেটে একরকম ঋণ নিতে বাধ্যই করা হয়।

গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনটি বাংলায় ভাষান্তরিত আকারে তুলে ধরা হলো:

চলতি বছরের শুরুতে চীনে করোনাভাইরাস মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে লু লিন্দি অনলাইন ছাড়া শপিং করেন না বললেই চলে; গুঁড়ো দুধ থেকে শুরু করে চীনা ওষুধ- সব কিছুর দাম পরিশোধে স্মার্টফোনে আলিপে অ্যাপ ব্যবহার করেন তিনি।

কিন্তু ৫৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি কয়েক সপ্তাহ ধরে বুঝতেই পারেননি যে তার অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার বদলে আলিপে আসলে তাকে ঋণ দিয়ে তার কেনাকাটায় লগ্নি করছে।

শুধু লু একা নন, আরও অনেক গ্রাহক মনে করেন, আলিপে অ্যাপটি এমনভাবে সাজানো যাতে মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে বা না বুঝেই ঋণ নিয়ে ফেলেন।

হংকং ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে ৩০ বিলিয়ন ডলারের আইপিও ছাড়ার আবেদনের সঙ্গে অ্যান্ট গ্রুপ যে নথিপত্র জমা দিয়েছে, তাতে চলতি বছর জুন শেষে ক্রেডিটটেক ইউনিট থেকে কোম্পানির রাজস্ব- যার বড় অংশই ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য অংশীদার ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে পাওয়া ফি- ৫৯ শতাংশ বেড়েছে বলে দেখানো হয়েছে। অ্যান্টের পুরো বিক্রির ৩৯ শতাংশই এখাত থেকে আসে।

বার্ন্সটেইনের বিশ্লেষক কেভিন কিউইকের হিসাবে প্রতিটি ঋণ সরবরাহ বাবদ আড়াই শতাংশ হারে ফি পেয়ে থাকে অ্যান্ট।

ক্ষুদ্র ব্যবসাকেও ঋণ সরবরাহকারী অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আলিপে অ্যান্টের রূপ বদলে দিয়েছে, যেটা একটা সহজ মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপ হওয়ার মধ্য দিয়ে মাসে ৭০ কোটিরও বেশি গ্রাহকের একটি ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।

মূলত দুটি পণ্যের মাধ্যমে অ্যান্টের ভোক্তা ঋণের ব্যবসা পরিচালিত হয়। এক. ‘হোয়াবেই’, যেটা অনেকটা গতানুগতিক ক্রেডিট কার্ডের মতো, দুই. ‘জিয়েবেই’ যেটা আলিপে অ্যাপের মাধ্যমে বন্ধকবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ।

অ্যাপের ব্যবহারকারীরা বলছেন, ছাড় ও বিভিন্ন অফার দিয়ে এ দুটি পণ্যের দিকে তাদের টেনে নেওয়া হয়। কখনো কখনো ঋণ নেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও পূর্বনির্ধারিতভাবে হোয়াবেই ব্যবহার করতে বাধ্য করে আলিপে।

৩৮ বছর বয়সী ভিনসেন্ট চেং বলেন, এটা সব সময় আপনাকে হোয়াবেই ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করবে। হোয়াবেই আপনার পূর্বনির্ধারিত পেমেন্ট মাধ্যম না হলেও চেকআউটের সময় অ্যাপটি অবিরত ডিসকাউন্ট ও প্রমোশন দিতে থাকবে, যেটা আপনাকে হোয়াবেইয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করতে বাধ্য করবে। এখন আপনি হঠাৎ যদি হোয়াবেইয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করেছেন তো মরেছেন। এটা তখন আপনার ডিফল্ট পেমেন্ট মেথড হয়ে যাবে।

৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরে হোয়াবেই ও জিয়েবেই থেকে প্রায় ৫০ কোটি ব্যবহারকারী ঋণ নিয়েছেন; হোয়াবেইয়ে মাথাপিছু গড় ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার আরএমবি (চীনা মুদ্রা) বা ২৯৫ ডলারে।

জেনিন ওং বলেন, তাকে এতো ঘন ঘন হোয়াবেইয়ের মাধ্যমে পরিশোধে বাধ্য করা হয় যে উপায়ান্তর না দেখে ভুল করেও যাতে এটার ব্যবহার কম হয়, সেজন্য তিনি ঋণের সীমা ৫০০ আরএমবিতে বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি।

তিনি বলেন, তারা কিছুক্ষণের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমার ঋণসীমা বাড়িয়ে দেবে, যাতে কখনও কোনো কিছু কিনতে আমার পর্যাপ্ত ব্যালান্স না থাকলেও আমার অজ্ঞাতেই হোয়াবেই দিয়ে সেটা পরিশোধ হয়ে যায়।

এবিষয়ে অ্যান্ট বলছে, অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে কোনো প্রশ্ন থাকলে তারা সহায়তার জন্য কোম্পানির কাস্টমার সার্ভিসের সহায়তা নিতে পারেন।

তবে আইপিও প্রস্তাবনায় কোম্পানিটি বলেছে, অ্যাপটি ব্যবহারকারীর আলিপে অ্যাকাউন্ট বা সংযুক্ত ডেবিট কার্ড থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণের অর্থ কেটে নেবে। সুতরাং সুদমুক্ত পরিশোধের সময়সীমা পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে ভোক্তারা হোয়াবেইয়ের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ করলেও তাদের কোনো সুদ দিতে হচ্ছে না।

গত দুই বছরের মতো ঋণ ব্যবসার প্রবৃদ্ধি সামনে অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষক কিউইক।

তবে সার্বিকভাবে চীনের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশের কথা এবং মানুষকে ঋণ নেওয়াতে আলিপের শক্তিশালী কৌশল কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “পেমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে এই সংযোগের ফলে প্রবৃদ্ধির এক অনন্য ভিত তৈরি হয়েছে।”

এর মধ্যে অনলাইন ঋণ সরবরাহের বিধিমালা কঠোর করেছে বেইজিং। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানবিহীন ‘ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি’ পর্যায়ে ঋণ সরবরাহকারীদের ৯৯ শতাংশ বাজারে টিকতে পারেনি। তবে অ্যান্ট ও টেনসেন্টের মতো আরও একগুচ্ছ অ্যাপের অবস্থান কিন্তু জোরালো হয়েছে।

এর ফলে অ্যান্টের ঋণ বিতরণ আরও বেড়েছে। জুন শেষে মোট বিতরণ করা ভোক্তা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন (২৫ হাজার ৩৩ কোটি ডলার), যা কোনো একক চীনা ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের চেয়েও বেশি।

তবে বিধিমালায় কড়াকড়ির কারণে অ্যান্টকেও ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করতে হয়েছে। কোম্পানিটির মোট ভোক্তা ঋণ স্থিতির ৮৮ শতাংশই এখন নিজের সহযোগী মাইব্যাংকসহ ব্যাংকিং অংশীদারদের মাধ্যমে সরাসরি বিতরণ করা হচ্ছে। ১০ শতাংশ নিরীক্ষার পর বাজারে বিক্রি করা হয় এবং দুই শতাংশ কোম্পানির ব্যালান্স শিটে ধরে রাখা হয়।

অগাস্টে চীনের সুপ্রিম কোর্ট ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার আন্তঃব্যাংক সুদ হারের চারগুণ বা বার্ষিক ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ হারে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে বলে রায় দেওয়ার পর এখন সরাসরি বা সিকিউরিটিজ আকারে সরবরাহ করা অ্যান্টের ঋণের একটা ছোট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে অ্যান্ট বলছে, বেশিরভাগ ঋণগ্রহিতারাই এই হারে বা এর চেয়ে কম হারে সুদ দিচ্ছেন। আর বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বলছেন, আদালতের আদেশের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়বে না।

তবে ভবিষ্যতে অ্যান্টের ব্যাংকিং অংশীদাররা সুদহারের সীমা নিয়ে আরও কড়াকড়ির মুখে পড়তে পারেন বলে মনে করেন বেইজিংয়ের রেনমিন ইউনিভার্সিটির ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ঝাও শিজুন।

তিনি বলেন, ঋণের সুদহার নিয়ন্ত্রণে রাখা ও কমিয়ে রাখাটা চীনে একটা সাধারণ প্রবণতা। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক নজরদারিতে থাকে এবং তাদের রিস্ক প্রিমিয়ামও কম। তাই স্বভাবতই তাদেরকে সর্বোচ্চ হার দেওয়া হবে, যদিও সেটাও আন্তঃব্যাংক হারের চার গুণের চেয়েও কম।

তারপরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যান্টের ব্যবসা অনেকগুলো আইনি বাধার মুখে পড়েছে; ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে নতুন ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি তৈরি করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে কোম্পানিকে।

কোম্পানির ঘনিষ্ট একজন বলেন, যখন আপনার সামনে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা থাকে তখন উদ্ভাবনটা ঘটে যায়।

 

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com