April 21, 2026, 4:59 am

নিরাপত্তা সংকটে গ্রামাঞ্চলের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো

নিরাপত্তা সংকটে গ্রামাঞ্চলের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো

দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগ গ্রাম অঞ্চলের শাখা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীর অভাব, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে অক্ষমতা, পুলিশ টহলের ব্যবস্থা না থাকা এবং সিসিটিভি ও স্পাই ক্যামেরার অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া নির্দেশনাগুলোও মানছে ব্যাংকগুলো। কারণ এতে তাদের খরচের পরিমাণ বেড়ে যায়, যেখানে ব্যাংকগুলোতে এখন চলছে ব্যয় সংকোচন নীতি।

গ্রামীণ এলাকার এটিএম বুথ ও এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমেও ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেট থেকে টাকা খোয়া যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। মঙ্গলবার কুমিল্লার মুরাদনগরে আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৭ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। ১০ মে যাত্রাবাড়ীতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৫৫ লাখ ও ৬ মে পাবনার ঈশ্বরদীতে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্টের ১১ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। হ্যাকারদের টার্গেট এখন গ্রামের এটিএম বুথগুলো।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের শাখাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করছে। ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ থেকে যেসব পরিদর্শক দল শাখায় যাচ্ছে তারা শাখার সার্বিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ভল্টের নিরাপত্তার মান নিয়েও প্রতিবেদন তৈরি করে। এছাড়া ব্যাংকগুলোও নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে ঘাটতি থাকলে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের চেয়ে বেড়েছে। যে কারণে ব্যাংকের শাখায় চুরি-ডাকাতি কমে এসেছে। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন থেকেও ব্যাংকের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের টাকা ছিনতাই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে হচ্ছে বলে মনে হয়। তারপরও এগুলো বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের শাখা, এটিএম বুথ ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তার জন্য ২০১৫ সালের ৫ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা সার্কুলার অনুযায়ী প্রতিটি শাখার প্রবেশপথে, ভেতরে, বাইরে, আইটি রুমে সিসিটিভি, আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) ক্যামেরা ও স্পাই (গোপন) ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। যথাযথ কর্মকর্তা দিয়ে এগুলো পরিচালনা করতে হবে। কখনই ক্যামেরা বন্ধ করা যাবে না। ভিডিও ফুটেজ এক বছর সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যাংকের শহুরে শাখায় এসব ব্যবস্থা থাকলেও বেশিরভাগ গ্রামীণ শাখায় নেই। কোথাও সিসিটিভি থাকলেও আইপি বা স্পাই ক্যামেরা নেই। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য নেই যথাযথ কর্মকর্তা। অনেক ক্ষেত্রেই বাইরের কর্মকর্তা দিয়ে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে।

সব শাখায় পর্যায়ক্রমে এন্টি থেফ্ট এলার্ম বসানোর নির্দেশনা থাকলেও গ্রামীণ শাখাগুলোতে এটি নেই। শাখায় একাধিক নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু গ্রামের বেশিরভাগ ব্যাংকের শাখায় নিরাপত্তা কর্মী আছে একজন। যিনি অনেক ক্ষেত্রে জনবল সংকটে অফিস সহকারী বা পিয়নের কাজও করেন। গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি ব্যাংকের শাখার একজন নিরাপত্তা কর্মী জানান, আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও তা সচল কিনা তা তিনি জানেন না। কেননা তাকে কখনও বন্দুক দিয়ে গুলি করতে হয়নি। এটি কখনও মেরামতও করা হয়নি।

সরকারি ব্যাংকগুলোর ভল্টের নিরাপত্তার ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। পরে বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ভল্টের ছাদ ও মেঝেসহ চারপাশের দেয়াল পুরপ্রকৌশল বিভাগ কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে। ভল্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক থাকতে হবে। ভল্টের প্রবেশপথে সিসিটিভি, ভেতরে স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র থাকতে হবে। ভল্টের ও এটিএম বুথে জমা অর্থের ওপর থাকবে বীমা ঝুঁকি। এজন্য আলাদা তহবিল গঠন করতে হবে। শহুরে শাখায় এ বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলেও গ্রামীণ শাখা একেবারেই অবহেলিত। ভল্ট বা এটিএম বুথে জমা টাকার ওপর কোনো বীমা নেই।

ব্যাংকে সম্ভাব্য চুরি-ডাকাতি বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি শাখায় স্বয়ংক্রিয় এলার্ম সিস্টেমস স্থাপন করার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু অনেক শাখায় তা নেই। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, থানা, র‌্যাবসহ অন্যান্য ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নম্বরে হটলাইন থাকার নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংক শাখার চারপাশের বাসিন্দাদের তথ্য রাখা ও তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক রাখতে হবে। কিন্তু শহর বা গ্রামীণ শাখার ব্যবস্থাপকরা এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুরের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক বলেন, আমার শাখায় কর্মকর্তা দরকার ৪০ জন। আছে ২০ জন। প্রত্যেকেই সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে আসেন রাত ৮টার আগে বেরোতে পারেন না। তার নিজের আরও বেশি সময় দিতে হয়। এ অবস্থায় সামাজিক সম্পর্ক রাখার বৈঠক কখন করব? তবে তিনি বলেন, আশপাশের অনেকেরই এখানে হিসাব রয়েছে। হিসাব পরিচালনার জন্য অনেকেই আসেন। তখন তাদের সঙ্গে কথা বলি।

সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাত্রিকালীন ব্যাংক কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট শাখা পরিদর্শন করার নিয়ম রয়েছে। এটি অনেকেই করে থাকেন। প্রতিটি শাখাকে নিকটস্থ থানার সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তা ও পুলিশি টহলের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশ ব্যস্ততার কারণে এ ধরনের টহল বেশিরভাগ সময়ই দিতে পারে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নে একটি ব্যাংকের শাখা রয়েছে। এটি সদর থানা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। ফলে এখানে সব সময় টহল পুলিশ পাওয়া যায় না।

সারা দেশে ৫৯টি ব্যাংকের শাখা রয়েছে ১০ হাজার ৫৮৮টি। এর মধ্যে শহরের শাখা ৫ হাজার ৩৬৯টি এবং পল্লীর শাখা ৫ হাজার ২৭টি। এছাড়া ইসলামিক ব্যাংকিং ইউন্ডো এবং এসএমই সার্ভিস সেন্টার রয়েছে ১০ হাজার ৬৮৫টি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট ৮ হাজার ৭৬৪টি এবং আউটলেট ১২ হাজার ৪৪৯টি। এটিএম বুথ ১১ হাজার ও পস মেশিন ৫৪ হাজার।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com