July 10, 2026, 7:08 pm

রিজার্ভের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে!

রিজার্ভের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে!

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি সম্প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বেশ আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ দেশের রিজার্ভ কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরকার সেটা মনে করছে না। বরং রিজার্ভের যৌক্তিক ব্যবহার হচ্ছে বলেই তাদের দাবি। গত কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে কমছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সম্প্রতি এটা ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি স্তরে নেমে যাওয়ার কারণেই সম্ভবত আলোচনা বা সমালোচনা বেশি মাত্রায় শোনা যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের অনেকের মতে, বর্তমানে রিজার্ভের যে দ্রুতগতিতে পতন ঘটছে, তা দেশকে সংকটে ফেলতে পারে। অন্যদিকে সরকারের মতে, রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বেশ কয়েক অর্থনীতিবিদও অবশ্য এর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সতর্কতা বজায় রেখে চলতে পারলে এ ক্ষেত্রে যে ঝুঁকির আশঙ্কা করা হচ্ছে তা মোকাবিলা করা যাবে। রিজার্ভের পতন ঠেকাতে অর্থনীতিবিদরা চারটি বিষয়ে নজর দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখিতার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানো, দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকানো এবং ডলারের মূল্য বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া।

প্রসঙ্গত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি থেকে আয়, রেমিট্যান্স, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন দেশ বা সংস্থা থেকে পাওয়া ঋণ ও অনুদান এসব খাত থেকেই মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে ওঠে। গচ্ছিত বৈদেশিক মুদ্রা প্রধানত আমদানি মূল্য, বৈদেশিক ঋণ এবং ঋণের সুদ ইত্যাদি পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বহু উন্নয়নশীল দেশের মতো করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলায় বাংলাদেশকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হওয়া ঋণ পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রিজার্ভ নিয়ে যত কথা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায় বিবেচনা করলে দেশের নিট রিজার্ভ ১৮ বিলিয়ন ডলারের কম হবে।

রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অত চিন্তার কিছু নেই। গত রবিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিসিএস কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আমরাও কিছু সমস্যায় আছি। রিজার্ভ নিয়ে অনেকে কথা বলে, আমি বলছিÑ এ নিয়ে অত চিন্তার কিছু নেই। আমার গোলায় যতক্ষণ খাবার আছে, ততক্ষণ চিন্তা করি না। দেশের প্রতি ইঞ্চি অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় আনতে হবে। ফসল ফলাব, নিজের খাবার নিজেরা খাব; কেনাকাটা বা খরচ না হয় আমরা একটু কমই করব। কিন্তু নিজের দেশের মর্যাদা রক্ষা করে আমাদের চলতে হবে।’

এর আগে গত ৬ অক্টোবর গণভবনে জাতিসংঘের ৭৮তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে রিজার্ভ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ যদি বলে রিজার্ভ রক্ষা করতে হবে, তাহলে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিই, সার বন্ধ করে দিই, সব বন্ধ করে বসে থাকি, রিজার্ভ ভালো থাকবে। রিজার্ভ বেশি রাখা প্রয়োজন, নাকি দেশের মানুষকে ভালো রাখা প্রয়োজন, কোনটা?’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনও রিজার্ভের বিষয়ে একই মতামত দিয়েছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, রিজার্ভ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে, তা অন্যায়। রিজার্ভ নিয়ে আমরা চিন্তিত, কিন্তু শঙ্কিত নই। তবে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের অর্থনীতি এখনও সবল আছে। অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলে আমরা এখন ভারতের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছি।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান গত সোমবার ইআরএফে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, দেশের রিজার্ভ এখন যা আছে, তা নিয়ে শঙ্কা নেই। তবে তার চেয়ে কমে গেলে বিপদ হতে পারে। রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকলে একসময় যদি তা ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, সেই সময় এমন হতে পারে যে, আইএমএফের সহায়তা পাওয়া যাবে না। তাই রিজার্ভ বাঁচাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হুন্ডি ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে। তবে তার মানে এই নয় যে, দেশে প্রবাসী আয় আসা বাস্তবে কমে গেছে। আনুষ্ঠানিক পথে না এসে অনানুষ্ঠানিক পথে আসছে, যার মূল মাধ্যম হুন্ডি। অর্থাৎ রিজার্ভ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা না হয়ে হুন্ডিতে জমা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, এই মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে আমাদের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেন ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে না নামে। রিজার্ভ বাঁচাতে বাংলাদেশকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উৎস থেকে সহায়তা পাওয়াসহ সম্ভাব্য সব বিকল্পের খোঁজ করতে হবে।

রিজার্ভ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ছাড়া জ্বালানি তেল, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধের মতো জরুরি পণ্য আমদানি করা সম্ভব হয় না। আর্থিক বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন রোধ, মুদ্রানীতি জোরদার করা, বাজেট বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৃহৎ প্রকল্পে অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ব্যবহৃত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার মাধ্যমে দেশীয় মুদ্রার বিনিময় হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। সংকটকালে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস জোগায় রিজার্ভ।

রিজার্ভের চালচিত্র

২০০৬ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩.৪৮৪ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে বেড়ে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট তা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের নজির সৃষ্টি করে। এরপর থেকে আবার কমতে কমতে এখন সেটা ২৬.৮৬ বিলিয়নে নেমে গেছে। এর জন্য রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি, রেমিট্যান্সের উল্টোগতি, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হ্রাস এবং অর্থ পাচারকে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি বা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর অর্থাৎ সর্বশেষ হালনাগাদ হিসাব থেকে দেখা যায়, সেই রিজার্ভ এখন কমে হয়েছে ২৬ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, সেটা ২১ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের আরেকটি হিসাব রয়েছে, যা জনগণের কাছে প্রকাশ না করে শুধু আইএমএফকে দেওয়া হয়। আইএমএফ সূত্রে জানা গেছে, সেই হিসাবে দেশের প্রকৃত রিজার্ভ এখন প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি বা ১৭ বিলিয়ন ডলার। গত দুই বছরে প্রতিমাসেই রিজার্ভ গড়ে ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলার হারে কমেছে। তথ্য মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এখন যে প্রকৃত রিজার্ভ আছে, তা দিয়ে শুধু তিন মাসের আমদানি খরচ মেটানো যাবে, অন্য কোনো খরচ নয়। সাধারণত একটি দেশের কাছে ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি খরচের সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। সেই হিসেবে বাংলাদেশ এখন শেষ প্রান্তে রয়েছে। একটি দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অন্যতম।

বাংলাদেশকে দেওয়া আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের অন্যতম শর্ত ছিল গত জুনে প্রকৃত রিজার্ভ ২ হাজার ৪৪৬ কোটি ডলার, গত সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৫৩০ ডলার এবং আসছে ডিসেম্বরে ২ হাজার ৬৮০ ডলারে রাখতে হবে। এর জন্য লিখিতভাবে বাংলাদেশকে প্রকৃত রিজার্ভের হিসাবায়ন পদ্ধতি জানিয়ে দেয় আইএমএফ। এই পদ্ধতি অনুযায়ী প্রকৃত রিজার্ভের তথ্য আইএমএফকে জানানো শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ রাখতে পারছে না তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি দায় মেটাতে চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) প্রথম তিন মাস আট দিনে রিজার্ভ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। ফলে গ্রস আন্তর্জাতিক রিজার্ভ কমে হয়েছে ২১ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে যা ২৬ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। সূত্র জানায়, মূলত জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানির জন্য ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংকটের কারণে বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তাই সরকারের আমদানির জন্য রিজার্ভ থেকে সহায়তা করা হচ্ছে।

গত অর্থবছরের ১২ মাসে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এভাবে ২৭ মাসে রিজার্ভ থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি হয়েছে।

২০২১ সালের আগস্টে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা এবং আইএমএফের ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ-সহায়তা যোগ হওয়ায় বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন নতুন উচ্চতায় উঠেছিল বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র। রিজার্ভের একটা বড় অংশ প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান বলে জানান তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবের পাশাপাশি ধীরে ধীরে রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের গতি কমে যাওয়া এবং বিদেশি ঋণ ও অনুদান কমে যাওয়ার কারণে আজ রিজার্ভের এই দশা

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com