July 10, 2026, 8:29 pm

সংকটে দেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী নেতৃত্ব নেই

সংকটে দেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী নেতৃত্ব নেই

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দেশ ভালো চলছে এ বর্ণনায় যদি আমি থাকি তাহলে অর্থনীতি চলা মুশকিল। আমাদের একজন অ্যাবসেন্ট অর্থমন্ত্রী আছেন, তিনি বললেন, ‘সব ঠিক আছে, সব ভালো চলছে।’

রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনমিক মডেলিং (সানেম) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট: টুয়ার্ডস ফাস্টার, ক্লিনার গ্রোথ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফ্রানজিসকা লিয়েসলটে অনসর্জ. ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ব্যারিষ্টার সামীর সাত্তার।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা অর্থনীতির টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকার সঠিক নীতি নির্ধারনের জন্য প্রায় দেড় বছর সময় পেয়েছিল, কিন্তু তারা নেয়নি। সরকার সাধারণ কথার মধ্যেই ছিল- আমরা ভালো করছি, ভালো করবো ইত্যাদি। বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলার কারণেই আজকে এ পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। আমার কথা হলো, ১৫ বছর সময় পেয়েছি, এগুলো কি সংশোধন করতে পারতাম না?

সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দেশ ভালো চলছে এ বর্ণনায় যদি আমি থাকি তাহলে অর্থনীতি চলা মুশকিল। আমাদের একজন অ্যাবসেন্ট অর্থমন্ত্রী আছেন, তিনি বললেন, ‘সব ঠিক আছে, সব ভালো চলছে।’ এ কথা তো জনগণ বুঝে না। এসব কথা যদি রাজনীতিবিদরা না বুঝেন, তাহলে তো আর বুঝানোর উপায় নেই। আমি দেখতে পাচ্ছি রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় সংকট রয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে নেতৃত্বের সংকট বেশি। এ সংকটময় মুহূর্তে একজন অর্থনীতিতে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বে দরকার ছিল। সেটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাদের সঠিক সিদ্ধান্তের পরামর্শ দিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, আমাদের দরকার কি ছিল। আমাদের পেমেন্ট লায়াবিলিটিস কি, আমার ঘাটতি কোথায়- এগুলোকে চিহ্নিত করে জবাব দিতে হবে আমাদের কোথায় কোথায় কি খরচ করতে হবে। সেগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নাই।

নির্বাচনকে সামনে রেখে কঠিন সময় আসছে স্বরণ করিয়ে তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচনও নয়। আমরা এমন কোনো শিল্পরাষ্ট্র নই যে সব তাদের মতো স্বাভাবিকভাবে হয়ে যাবে। এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা বাড়বে।

এখনই অর্থনীতির সংকট সামাল দেয়ার পরামর্শ দিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদেরকে এখনই স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এমনভাবে ব্রেক কষতে হবে যাতে রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে কিছুতেই না নামে। এটা আমাদের এখনই করতে হবে। আপনার কাছে বহু অপশন আছে, এ সংকট ঠেকানোর জন্য। সেগুলো ব্যবহার করে রিজার্ভ পতন ঠেকান।
অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, কভিডের আগের দশকটা যদি ধরি, সে সময় আমাদের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ছিল। কিন্তু সে সুসময়ে আমাদের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে আসেনি। গত দুই বছরে আমাদের সব খাতের দুর্বলতা সামনে চলে এসেছে।

তিনি বলেন, প্রবাসীরা ইনফরমাল চ্যানেল ব্যবহার করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। এভাবে হুন্ডিতে অর্থ পাঠালে অর্থপাচারকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি রাস্তা তৈরী হচ্ছে। আইএমএফের শর্তে গিয়েছে সরকার। অথচ এগুলোর কথা গত ১০ বছর ধরেই আলোচিত হচ্ছে।

সামনের অর্থনীতির সংকটের কথা স্বরণ করিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, আগামী ২ থেকে ৩ বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনাটা কোনো ছেলেখেলা নয়। এখানে রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অসাধু চক্রের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, দেশে একটি অসাধু চক্র আছে যারা সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তে নানাভাবে বাধা দিয়ে আসছে। এরকম অসাধু গ্রুপগুলোর বাইরে গিয়ে সংস্কার আনা জরুরী। আমাদের মনে রাখতে হবে শ্রীলঙ্কা এক সময় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ ছিল, কিন্তু তাদের প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তারা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।

তিনিও আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, অর্থনীতিতে এখনই একটা ব্রেক কষতে হবে যাতে এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় আর না যায়।
অনুষ্ঠানে ড. ফ্রানজিসকা লিয়েসলটে অনসজ বলেন, দেশের কম উৎপাদনশীলতা রাজস্ব আয় কম হওয়ার একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে। আর বাংলাদেশ এখনই খেলাপি হবে না, সেটি বহুদূর। আমি মনে করি, কর আদায় ব্যাপারটি খুবই সহজ। এগুলো এখন জনে জনে না বলে কম্পিউটারাইজড করাটা বেশি যৌক্তিক হবে। এ মুহূর্তে কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তিনি তার উপস্থাপিত প্রেজেন্টেশনে চারটি প্রশ্নের বিপরীতে চারটি উত্তর উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন আসলে উত্তর হবে, খুব দ্রুত প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে, তবে পতনের শঙ্কাও রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ কি এমন প্রশ্ন হলে উত্তর হবে, খুব বেশি ঋণ, কম রাজস্ব আদায়, কয়েকটি দেশ তো ঋণের চাপে আছে। অতীতের উচ্চ ঋণে কি ঘটেছিল, এমন প্রশ্নে উত্তর হবে, মাঝপথে এসে আর্থিক সংকট দেখা দেওয়া। কয়েকটি ঋণখেলাপির উদাহরণও আছে এ অঞ্চলে। সমস্যা সমাধানে করণীয় কি এমন প্রশ্নে উত্তর হবে, সামনে বহু অপশন আছে, তবে কোনোটাই সহজ নয়।

অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি সামীর সাত্তার বলেন, বাংলাদেশ জিডিপির তুলনায় ঋণ ৩২ শতাংশের বেশি। এটি ঠিক আছে। কিন্তু কর জিডিপির অনুপাত বিশ্বে সবচেয়ে কম। মূল সমস্যাটা করজাল নিয়ে। মোট কর আদায়ের ৯০ শতাংশই শুধুমাত্র ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক। কেন জামালপুরের মানুষের কর আদায় ঠিক মতো হয় না, কেন অন্য অঞ্চলে রাজস্ব বোর্ড সক্রিয় হতে পারছে না। রাজস্ব খাতে আমাদের বেস্ট অফিসার প্রয়োজন, নইল শুধু ভবন করে লাভ নেই।

তিনি বলেন, দেশের ইনফরমাল খাতগুলো করের আওতার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। ঢাকায় রাস্তার পাশে অনেক দোকান আছে এদেরকে করের আওতায় আনা হচ্ছে না।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com