July 7, 2026, 8:09 pm

নিজেরাই লুটেপুটে খাচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা

নিজেরাই লুটেপুটে খাচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা

ব্যাংকের পর বেরিয়ে এলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালকদের ঋণের তথ্য। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আথিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পরিচালকরা বাগিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ। অধিকাংশ ঋণের বিপরীতে রাখা হয়নি জামানত। আবার কোনো কোনো ঋণের জামানত হিসেবে রাখা হয়েছে সরকারি জমি, নদী বা কবরস্থান।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, দেশের বর্তমানে কার্যরত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৭১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এদের মধ্যে ২৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে। যেই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে পরিচালকদের যেকোনো অঙ্কের ঋণে জামানতের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদের জামানত না নিয়ে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আইন লঙ্ঘন করে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যে কারণে ঠিকমতো ঋণ আদায় করতে না পেরে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।

দুর্নীতি, অনিয়ম আর ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে বরাবরের মতোই আলোচনায় দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ৯০ শতাংশেরও বেশি। ঋণ জালিয়াতি ও নিয়মিত কাজে পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে বিপাকে রয়েছে বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে প্রশান্ত কুমার হালদার ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে যাওয়ার পর ২০১৯ সালে আর্থিক খাতের আলোচনার মূলে চলে আসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, পরিচালকদের সবচেয়ে বেশি দিয়েছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইউনিয়ন ক্যাপিটাল ঋণ বিতরণ করেছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে পরিচালকদের ঋণ প্রায় হাজার কোটি। ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রাইম ফাইন্যান্সও দিয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ। আড়াইশ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ও লংকা বাংলা ফাইন্যান্স। ২০০ কোটির বেশি ঋণ দিয়েছে আভিভা ফাইন্যান্স ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স।

এ ছাড়া আরও তালিকায় আছে হজ ফাইন্যান্স, মাইডাস ফাইন্যান্স, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যত টাকার ঋণ বিতরণ করেছে তার ২৫ ভাগ খেলাপি হয়ে পড়েছে। তথ্য মতে, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। এই সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণস্থিতি ছিল ৭১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২২ সালের মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ১৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টানা তিন বছর ডেফারেল সুবিধা ছিল। ডেফারেল বা বিশেষ সুবিধা নিয়ে অনেকে খেলাপি থেকে মুক্ত ছিল। এ সুবিধা তুলে নেওয়ার কারণে আবার তারা খেলাপি হয়ে গেছে। ফলে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে পুরো খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ ছাড়া গত ডিসেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি ঋণের যে তথ্য দিয়েছিল, তা নিরীক্ষিত ছিল না। তাই পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ খেলাপি করে দেওয়া হয়। এ কারণেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানান।

এদিকে বর্তমানে ব্যাংক খাতে পরিচালকদের ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০১৬ সালে এই ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ ৬ বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৬৯ শতাংশ। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি ৬১ ব্যাংকের মধ্যে ৫৮টি ব্যাংকই পরিচালকদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক পরিচালকদের ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে। আর দুটি ব্যাংকের পরিচালকরা নিজেদের ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন। আইন ভঙ্গ করে এমন ঋণ নেওয়া হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com