July 12, 2026, 2:26 am

তৈরি পোশাকের রফতানি আদেশে বড় ধাক্কা

তৈরি পোশাকের রফতানি আদেশে বড় ধাক্কা

দেশের অর্থনীতির সব সূচক যেখানে চরম মন্দা সেখানে একমাত্র রফতানি খাতে কিছুটা ইতিবাচক ধারা রয়েছে বিগত কয়েক মাস ধরে। তবে এখন এ খাতেও বড় ধাক্কা লাগছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আদেশ কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। এর প্রভাবে এরই মধ্যে ইউরোপের বাজারে ২০ শতাংশ পোশাক পণ্যের আদেশ কমে গেছে। বাংলাদেশে মোট পোশাক রফতানির ৫৬ শতাংশ যায় ইউরোপে। শুধু তাই নয়, একক বৃহৎ বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যান্য এলাকা থেকেও পোশাক রফতানি আদেশ কমে আসছে। এতে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা।

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশি^ক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সার্বিকভাবে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে যেতে হচ্ছে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের। ইতোমধ্যে পশ্চিমা ভোক্তারা তাদের ব্যক্তিগত খরচেও বেশি হিসেবি হয়ে উঠেছেন। যে কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ওয়ার্ক অর্ডারের সংখ্যা ২০ শতাংশের মতো কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক খুচরা পোশাক বিক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্ডার দিয়েছিল, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তারচেয়ে ২০ শতাংশ কম অর্ডার দিয়েছে। সেখানকার ক্রেতাদের কাছে আগের মতো পণ্য বিক্রি করতে পারছে না খুচরা বিক্রেতারা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভোক্তারা আগের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি ও খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তারা পোশাকের বাজেট কমিয়েছেন।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে গ্যাসের দাম প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। জ্বালানি ও খাদ্যে খরচ বাড়ায় বাংলাদেশের মতো তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফারুক হাসান উল্লেখ করেন, আসন্ন বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) কমেছে ২০ শতাংশের মতো।

যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাজারে এ দুটি পণ্যের দাম অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে বাংলাদেশসহ বিশে^র প্রায় সব দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। বেড়ে যায় উৎপাদন খরচ। শুধু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ নয়, ইউরোপ-আমেরিকার মানুষও জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর প্রভাবে দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপে অসহায় হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে।

অত্যাসন্ন বিশ্বমন্দা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা। একপক্ষ বলছেন, যুদ্ধের কারণে ইউরোপ মন্দায় চলে যাবে। কারণ চলমান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইউরোপ। এর বাইরে অন্য দেশগুলোতে মন্দা নাও হতে পারে। তবে কমে যাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার। অন্যপক্ষের মতে, বিশ^মন্দা হলে সব দেশই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বড় অর্থনীতির দেশে মন্দা না হলেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেল থাকার কারণে যুদ্ধের প্রভাব অতটা লাগেনি।

চীনের বিষয়টি ভিন্ন। কোভিডের কারণে লকডাউন চলছে সেখানে। ফলে দেশটির প্রবৃদ্ধিতে চলছে শ্লথগতিতে। গত তিন প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশের কম। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি মন্দার সম্ভাবনা কম। তবে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে একেক দেশের পরিস্থিতি একেক রকম হবে। তবে সব দেশেই প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো দেশে মন্দা দেখা দেবে। আবার কোনো দেশে হয়তো নাও হতে পারে। এটা নির্ভর করবে মন্দা মোকাবিলায় দেশগুলোর সক্ষমতা এবং কী ধরনের নীতি-সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক ঊর্ধ্বতন পরিচালক ড. জায়েদ বখত মনে করেন, মন্দার ঝুঁকি আছে সারা বিশ্বে। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সঙ্কোচনমূলক নীতি নিচ্ছে। ফলে বিশ্বমন্দার একটা আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিশ^মন্দা হলে সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এটি মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে হবে। অর্থনীতির চাকা যাতে সচল থাকে, সে জন্য সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে।’

এদিকে বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ওইসব কারখানার মালিক, যারা সম্প্রতি অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছিলেন। অনেক কারখানাই আকার বাড়িয়েছিল। ডাবল শিফটও চালু করেছিল অনেকে। সেসব কারখানা পড়তে পারে বেশি বিপাকে।

কার্যাদেশ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আসন্ন বসন্ত ও গ্রীষ্মে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন ৩০ শতাংশ। চার মাস আগের তুলনায় এনকোয়ারি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এক মাস পরও একই পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে।

এদিকে পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রফতানি করে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত মে মাসে এই ধারা অব্যাহত থাকেনি। এপ্রিলের ৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার থেকে মে মাসে তৈরি পোশাকের চালানের পরিমাণ কমে ৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার হয়।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বিশ^ব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের বেশ ভাবাচ্ছে। এরই মধ্যে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। কাঁচামালের দামও বেড়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইউরোপে এবার ২৫ বছরের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। আমেরিকায় ৪০ বছরের সর্বোচ্চ। এ ছাড়া জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে সব কিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিদিনই প্রোডাকশন কস্ট বাড়ছে। দুদিক দিয়ে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে বিপদ লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথমত, গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের পোশাক তৈরিতে খরচ বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, চাহিদা কমেছে।

তিনি বলেন, মানুষ এখন জীবিকা নিয়েই হিমশিম খাচ্ছে। বায়াররা তাদের কাস্টমারদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে না, সব চাপাচ্ছে আমাদের ওপর। এতে আমাদের খরচ বাড়লেও দাম বেশি পাচ্ছি না। মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইতোমধ্যে অর্ডার কমতে শুরু করেছে। সামনে আরও কমার আশঙ্কা আছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির কারণে করোনা-পরবর্তী যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল সেটা ধরে রাখা কঠিন হবে। কারণ, মানুষের মধ্যে না কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মার্কেটে না যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com