July 12, 2026, 7:25 pm

ইস্তেখারার নামাজ কী ও কেন?

ইস্তেখারার নামাজ কী ও কেন?

কোনো কাজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছেন? দোদুল্যমানতা ও দোটানায় আটকে আছেন? মন অস্থির হয়ে পেন্ডুলামের মতো একবার এই দিক— আরেকবার ওইদিক করছে? কী করবেন তাহলে?

আসলে মানুষকে তো সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। নানা কাজে নানা কারণে প্রতিনিয়ত পদক্ষেপ নেওয়া লাগে। সিদ্ধান্তের প্রকারভেদে স্বস্তি ও অস্বস্তি তৈরি হয়। কারণ, সিদ্ধান্ত নেওয়া বিনে জীবনযাপন অসম্ভব। তাই নিতে যাওয়া সিদ্ধান্তটি সঠিক না বেঠিক এটা মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। আবার সিদ্ধান্তকৃত কাজটি করতে গিয়ে মানুষ আল্লাহর সাহায্য কামনা করে। চাই কাজটি গৌণ হোক কিংবা বৃহৎ— এটি পৃথিবীর সব মানুষের বেলায় ঘটে।

কিন্তু মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে ও কোন সিদ্ধান্ত তার জন্য কল্যাণকর হবে এবং কীভাবে বিষয় নির্বাচন করবে— এ ব্যাপারে ইসলামের সুন্দর দিকনির্দেশনা রয়েছে। যেন মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য লাভে ধন্য হয় এজন্য রাসুল (সা.) ‘ইস্তেখারা’র নামাজ শিক্ষা দিয়েছেন। তাই ইস্তেখারা বিষয়টি কী এবং ইস্তেখারার নামাজ পড়ার পদ্ধতি কী- জেনে রাখা উচিত।

জাবের বিন আবদুল্লাহর আল-সুলামি (রা.) বর্ণনা করে বলেন, রাসুল (সা.) তার সাহাবিদের সব বিষয়ে ইস্তেখারা করার শিক্ষা দিতেন; যেভাবে তিনি তাদের কোরআনের সুরা শিক্ষা দিতেন।

তিনি বলতেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের উদ্যোগ নেয়, তখন সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে। অতঃপর বলে (আরবি দোয়া) :

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ وَأَنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوبِ، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي ـ أَوْ قَالَ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ ـ فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي ـ أَوْ قَالَ فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ ـ فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ‏

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্তাখিরুকা বি ইলমিকা ওয়াস্তাকদিরুকা বি কুদরাতিকা; ওয়া আসআলুকা মিন ফাদ্বলিকাল আজিম। ফাইন্নাকা তাকদিরু ওয়ালা আকদিরু, ওয়া তা’লামু ওয়ালা আ’লামু; ওয়া আন্তা আল্লামুল গুয়ুব। আল্লাহুম্মা ইন্কুন্তা তা’লামু আন্না হাযাল আম্রা (এখানে নিজের কাজের কথা মনে মনে উল্লেখ করবেন) খাইরুন-লি ফি দ্বীনি, ওয়া মাআশি ওয়া আ-ক্বিবাতি আমরি (অথবা বলবে: আ’ জিলি আমরি ওয়া আজিলিহি); ফাকদিরহু লি ওয়া ইয়াসসিরহু লি, সুম্মা বারিকলি ফি-হি; ওয়া ইন কুনতা তা’লামু আন্না হাযাল আম্রা (এখানে নিজের কাজের কথা মনে মনে উল্লেখ করবেন) শাররুন লি ফি দ্বীনি ওয়া মাআশি ওয়া আ-ক্বিবাতি আমরি (অথবা বলবে- আ জিলি আমরী ওয়া আজিলিহি); ফাসরিফহু আন্নি- ওয়াসরিফনি আনহু, ওয়াকদির লিয়াল খাইরা হাইসু কানা সুম্মারদ্বিনি বিহি।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের সাহায্যে আপনার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আমি আপনার শক্তির সাহায্যে শক্তি ও আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। কেননা, আপনিই ক্ষমতাবান; আমি ক্ষমতা রাখি না। আপনি জ্ঞান রাখেন, আমার জ্ঞান নেই এবং আপনি অদৃশ্য বিষয়ে সম্পূর্ণ পরিজ্ঞাত।

হে আল্লাহ! আপনার জ্ঞানে আমার এ কাজ (নিজের প্রয়োজনের নামোল্লেখ করবে অথবা মনে মনে স্মরণ করবে) আমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য (কিংবা বলবে আমার দ্বীনদারি, জীবন-জীবিকা ও কর্মের পরিণামে) কল্যাণকর হলে, আপনি তা আমার জন্য নির্ধারণ করে দিন। সেটা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং তাতে বরকত দিন।

হে আল্লাহ! আর যদি আপনার জ্ঞানে আমার এ কাজ আমার দ্বীনদারি, জীবন-জীবিকা ও কর্মের পরিণামে (কিংবা বলবে, আমার বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য) অকল্যাণকর হয়, তবে আপনি আমাকে তা থেকে ফিরিয়ে দিন এবং সেটাকেও আমার থেকে ফিরিয়ে রাখুন। আমার জন্য সর্বক্ষেত্রে কল্যাণ নির্ধারণ করে রাখুন এবং আমাকে সেটার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩৮২-৬৮৪১; তিরমিজি, হাদিস : ৬৪৮)

ইস্তেখারার নামাজ কী ও কেন?

প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনে হাজার (রহ.) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন, ইস্তেখারা করা মানে কোনো বিষয় বাছাই ও নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে ব্যক্তিকে দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয় বাছাই করে নিতে হবে, সে যেন উত্তমটি বাছাই করে নিতে পারে, সে প্রার্থনা করা।

ইবনে আবু জামরা (রহ.) বলেন, ইস্তেখারার গণ্ডি শুধু ‘মুবাহ’ (করলে অসুবিধা নেই এমন) বিষয়ের ক্ষেত্রে এবং এমন মুস্তাহাবের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, যে মুস্তাহাব অপর একটি মুস্তাহাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক; সুতরাং দুটির কোনটি আগে পালন করবে কিংবা কোনটি বাদ দিয়ে কোনটি পালন করবে— সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অবশ্য ইস্তেখারা বড়-ছোট সব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ অনেক ছোটখাটো বিষয়ের ওপর অনেক বড় বিষয়ও নির্ভর করে থাকে।

ইস্তেখারার দোয়ার আগে নামাজ যে কারণে

ইবনে আবু জামরা (রহ.) আরও বলেন, ইস্তেখারার দোয়ার আগে নামাজ পড়ার রহস্য হলো, ইস্তেখারার উদ্দেশ্য হচ্ছে, একসঙ্গে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করা। আর এটি পেতে হলে মহান আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়া প্রয়োজন। আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তার স্তুতি জ্ঞাপন ও তার কাছে ধরনা দেওয়ার ক্ষেত্রে নামাজের চেয়ে কার্যকর ও সফল আর কিছু নেই। মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহকে বলা আপনি আমার জন্য সেটা সহজ করে দেন।

মোট কথা, যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আল্লাহর সাহায্য পেতে এবং কল্যাণকর কাজ নির্বাচন করতে ইস্তেখারার নামাজ পড়তে হয়। এ নামাজ পড়ার নিয়ম হলো, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে উল্লিখিত দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য ও কাজ যেন সহজসাধ্য হয় সে প্রার্থনা করা।

শায়খ মাহমুদুল হাসান আল-আজহারী ।। খতিব ও প্রিন্সিপাল, দ্য অ্যাসেক্স জামে মসজিদ ও অ্যাকাডেমি এবং পরিচালক, টিভিওয়ান ইউকে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com