August 26, 2026, 11:16 pm
তন্ময় ইসলাম: দেশের একমাত্র মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও নির্মাণমান নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটি। তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, এমআরটি লাইন-৬ এখন একাধিক কাঠামোগত ও পরিচালনগত ত্রুটি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পুরো রুটে পরিদর্শন করা বেয়ারিং প্যাডের ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ বা ৭৩০টি ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে ৪৬টি পিয়ার হেড ও অন্তত ২০টি বক্স গার্ডারে ফাটল শনাক্ত হয়েছে। ট্রেনের অস্বাভাবিক কম্পন ও ঝাঁকুনির কারণে ১০টি স্থানে গতিসীমা কমিয়ে চালানো হচ্ছে, আন্ডারশুটিং সমস্যার কারণে পাঁচটি ট্রেনসেট অপারেশন থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে এবং পুরো ব্যবস্থায় এখনো কোনো রিয়েল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং (এসএইচএম) ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কমিটির ভাষায়, এসব ত্রুটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি ‘যৌগিক ঝুঁকি প্রোফাইল’ তৈরি করেছে, যা যাত্রী নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য উদ্বেগজনক।
গত বছরের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট এলাকায় একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে পথচারীর মৃত্যুর ঘটনার পর হাইকোর্ট ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ডিএমটিসিএল নয় সদস্যের একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটি গঠন করে। চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন গত মে মাসে জমা দেওয়া হয়।অডিটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে বেয়ারিং প্যাডের অবস্থা। বেয়ারিং প্যাড মেট্রোরেলের উড়াল কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি, যা ট্রেনের ওজন ও কম্পন পিলারে স্থানান্তর করে। কমিটির পরিদর্শনে দেখা গেছে, ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ।
৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে ট্রেন চলাচলের সময় বেয়ারিং প্যাডে অস্বাভাবিক ধাক্কা লাগছে এবং ৪২৩ নম্বর পিয়ারে একটি বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। কমিটির মতে, এসব ত্রুটির পেছনে নিম্নমানের উপকরণ, নির্মাণ ত্রুটি কিংবা নকশাগত দুর্বলতা-সবকটিই সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত ত্রুটির মূল কারণ নির্ণয় কিংবা পূর্ণাঙ্গ প্রতিস্থাপন কর্মসূচির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বেয়ারিং প্যাডের পাশাপাশি ৪৬টি পিয়ার হেড ও ২০টি বক্স গার্ডারে ফাটল শনাক্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও কংক্রিট খসে পড়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে। বিশেষ করে ৩৪১ নম্বর পিয়ারের ফাটল নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বড় হওয়ায় সেটিকে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে কমিটি। অথচ এসব ফাটলের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ক্র্যাক গেজ স্থাপন কিংবা অনুমোদিত প্রকৌশল পদ্ধতিতে মেরামতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কমিটির মতে, এ ধরনের অবহেলা ভবিষ্যতে কাঠামোগত ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অডিটে আরও বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক কম্পন, ঝাঁকুনি, ট্র্যাকের ত্রুটি এবং বেয়ারিং প্যাডের সমস্যার কারণে মেট্রোরেলের যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। মূল নকশা অনুযায়ী ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ১০টি অংশে টেম্পোরারি স্পিড রেস্ট্রিকশন (টিএসআর) জারি রয়েছে।
এসব স্থানে ট্রেন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। কোনো কোনো অংশে প্রকৃত গতি নেমে আসছে মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটার পর্যন্ত। কমিটির পর্যবেক্ষণ, মূল সমস্যার সমাধান না করে শুধু গতি কমিয়ে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা স্থায়ী সমাধান নয়।
পরিচালনগত সমস্যার মধ্যেও সবচেয়ে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ট্রেনের আন্ডারশুটিং। অস্বাভাবিক ব্রেকিংয়ের কারণে ট্রেন নির্ধারিত স্টপিং পয়েন্টের আগেই থেমে যাচ্ছে। ফলে ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে এবং যাত্রীদের পড়ে যাওয়া বা আটকে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে।
এই সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেনসেট রাজস্বভিত্তিক পরিচালনা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রেনের চাকার ক্ষয়, সম্ভাব্য ফাটল, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রম্নটি এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে ক্রমাগত বৈদ্যুতিক স্পার্কিংকেও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিন বছরের বেশি সময় ধরে ডিপো এলাকায় ট্র্যাক বসে যাওয়ার সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত মেরামত করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় রেল পরীক্ষা যন্ত্র, বিশেষায়িত রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম ও খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত্ম অনেক ত্রম্নটি সময়মতো শনাক্ত ও সমাধান করা যাচ্ছে না।
অডিটে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে যে, এখনো পুরো মেট্রোরেলে কোনো কার্যকর রিয়েল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। ফলে পিলারের ফাটল, বেয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতি, ট্র্যাক বসে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক কম্পনের মতো বিষয়গুলো তাত্ক্ষণিকভাবে শনাক্ত করার সুযোগ নেই।
পুরো ব্যবস্থাই মূলত চাড়্গুষ পরিদর্শন ও সমস্যা দেখা দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়াভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নির্ভর করছে।
এ বিষয়ে অডিট কমিটির সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে বেয়ারিং প্যাডে ব্র্যাকেট বসানো, গতি কমিয়ে ট্রেন চালানো কিংবা অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণের মতো পদক্ষেপগুলো মূলত সাময়িক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। এগুলো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাঁর মতে, যে অবকাঠামো ২০ থেকে ২৫ বছর দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, সেটি শুরুতেই অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও গতিসীমা সংকোচনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় কমিটি জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকির বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন, ফাটল পর্যবেক্ষণে ক্র্যাক গেজ স্থাপন, পূর্ণাঙ্গ ডায়নামিক ভাইব্রেশন পরীক্ষা, ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ত্রুটি দূরীকরণ এবং আন্ত্মর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে স্মার্ট স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল ত্রম্নটি ব্যবস্থাপনা এবং স্বাধীন সেফটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছে কমিটি। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাসত্মবায়ন না হলে মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।