October 13, 2026, 7:40 am
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির টানাপড়েনের মধ্যে বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি বেশ হতাশাজনক। তবে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত টানা উত্থান বিনিয়োগকারীদের বেশ আশাবাদী করেছিল।
এরপর নানা ইস্যুতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশের মধ্যে মতভিন্নতার প্রভাবে টানা কয়েক মাস সংশোধন শেষে নতুন বছরে যে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, তা প্রথমে ধাক্কা খায় শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে। এরপর ফেব্রুয়ারির শেষে ইউক্রেনে রুশ হামলা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আর বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে বিপর্যয়।
এমনিতেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাবে ভুগতে থাকা দেশের পুঁজিবাজার। ব্যক্তি-শ্রেণির যে বিনিয়োগকারীরা আছেন, তারা বিনিয়োগের মূলতত্ত্বের বাইরে গিয়ে গুজব, গুঞ্জনে কান দেন বেশি। নানা সময় দেখা গেছে, তারা গুজবে শেয়ার কেনেন, আতঙ্কে বেচেন।
অথচ পরিস্থিতি এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। ২০২০ সালের মে মাসে শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এমন সব পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে, যা এতদিন দেখা যায়নি।
বেশ কিছু বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানিতে প্রাণ ফিরেছে কমিশনের উদ্যোগে। কয়েকটি কোম্পানিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে, কিছু কোম্পানি পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। ২০০৯ সালে ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসিতে পাঠিয়ে দেয়া কয়েকটি কোম্পানি মুনাফায় ফেরার পর পুঁজিবাজারেও ফিরেছে।
যেসব কোম্পানি টাকা তুলে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোকে ডি লিস্টিংয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে তারা বিনিয়োগকারীদের তাদের টাকা ফিরিয়ে দেবে।
বেশি কিছু আইন-কানুন, বিধিবিধান সংস্কার করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে। কোম্পানিগুলোকে বোনাস লভ্যাংশের বদলে নগদ লভ্যাংশ দিতে অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে।
আবার সংকটের মধ্যে শেয়ারের সর্বনিম্ন দর বেঁধে দিয়ে পুঁজির সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে, যে অস্ত্র এখন পর্যন্ত দুইবার প্রয়োগ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাজারে কারসাজির কারণে নিয়মিত শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এই কমিশনের চেষ্টা ও বারবার আলোচনার পর বিনিয়োগকারীদের এক যুগের একটি দাবিও পূরণ হয়েছে। ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার গণনা শেয়ারের বাজারমূল্যের বদলে ক্রয়মূল্যে নির্ধারণের কারণে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে কমিশনের উদ্যোগ দৃশ্যমান। ফান্ডগুলো নগদে গত দুই বছর দারুণ লভ্যাংশ দিয়েছে। ইউনিটদরের তুলনায় তাদের লভ্যাংশ যেকোনো সঞ্চয়ী আমানতের চেয়ে বেশি।
বন্ড মার্কেট উন্নয়নেও কমিশনের ভূমিকা রয়েছে। ইসলামী গ্রিন সুকুকের পাশাপাশি সরকারি ট্রেজারি বন্ডেরও লেনদেন শুরু হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীকে নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ লভ্যাংশ নিশ্চিত করবে।
সবার জন্য আইপিও শেয়ার নিশ্চিত করাও কমিশনের উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন। এর আগে লটারি করে শেয়ার বণ্টন হতো, তাতে হাতে গোনা কয়েকজন পেতেন সুবিধা।
এত সব পরিবর্তন ও চেষ্টার পরও পুঁজিবাজার তার কাঙ্ক্ষিত গতিতে ছুটতে পারছে না। ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা অল্পতেই ভীত হন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেই।
২০২০ সালের মে মাসে শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। কমিশনার হিসেবে যোগ দেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ, মিজানুর রহমান ও রুমানা ইসলাম। যোগ দেন সাবেক বাণিজ্যসচিব আব্দুল হালিম।
এই কমিশন দায়িত্ব নেয়ার সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বা ডিএসইর সাধারণ সূচক ছিল ৪ হাজারের নিচে। আর লেনদেন নেমে এসেছিল ১০০ কোটি টাকার নিচে।
১৫ মাসের মধ্যে সূচক বেড়ে হয় ৭ হাজার ৩০০ পয়েন্ট, লেনদেন তিন হাজার কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এরপর ঘটে ছন্দঃপতন।