October 13, 2026, 10:53 am

গরিবের আয়ের ৩২ শতাংশই খরচ হয় চালে

গরিবের আয়ের ৩২ শতাংশই খরচ হয় চালে

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠির পরিবারের ব্যয়ের এক তৃতীয়াংশ খরচ হয় চালের পেছনে। চাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে তারা মোট ব্যয়ের ৩২ শতাংশ খরচ করে । আর জাতীয় ভাবে চালে খরচ হয় ব্যয়ের ২১ শতাংশ। একই সঙ্গে চালের দাম বাড়লে দরিদ্র মানুষেরা মাছ মাংসের মতো পুষ্টিকর খাবারের ব্যয় কমিয়ে শাক সবজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ উন্নায়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস ভবনে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষক ওয়াসেল বিন শাহাদাত। এতে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন।

প্রতিবেদনে ২০১৬ সালের খানা জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে মানুষের খাদ্য গ্রহণের ধরণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। যেখানে ১৩২টি খাদ্য পণ্যকে ৯টি খাতের মাধ্যমে শ্রেনীবদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরী করতে ১২ হাজার পরিবারের তথ্য নেয়া হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠি তাদের মোট ব্যয়ের ২৯ শতাংশ ব্যয় করে চালের জন্য। তবে খাদ্যের পিছনে মোট জাতীয় ব্যয়ের ২১ শতাংশ খরচ হয় চালের পিছনে। আর দরিদ্র না ( নন পুওর) এমন পরিবার চালের পেছনে খরচ করে ব্যয়ের দুই শতাংশ। শহরের থেকে গ্রামের মানুষ চালের পেছনে বেশি ব্যয় করে। শহরের মানুষ ব্যয়ের ১৯ শতাংশ খরচ করে সেখানে গ্রামের মানুষ খরচ করে ২৩ শতাংশ।

ওয়াসেল বিন শাহাদাত তাঁর প্রতিবেদনে জানান, দরিদ্র থেকে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে চাল অত্যাবশ্যকীয়। তাই বাজারে চালের দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের এ পণ্যের ভোগের পরিমাণ কমে না। তবে চালের দাম বাড়লে তারা পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের ব্যয় কমিয়ে দেয়। পুষ্টিকর খাবরের হিসেবে পরিচিত মাছ, মাংস, ফলমূল ও ডালের চাহিদা বাদ দিয়ে সবজির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায় তাদের।
এদিকে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা বেশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে থাকে প্রতিবেদনে বলা হয়। পণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে মাছ-মাংসের চাহিদা কমে গিয়ে বেড়ে যায় শাকসবজির চাহিদা।

মূল প্রবন্ধে ড.সাদাত বলেন, গ্রামের মনুষেরা শহরের মানুষের চেয়ে বেশি ব্যয় করে চাউলের পেছনে। গ্রামের মানুষেরা জাতীয়ভাবে নিজের মোট আয়ের ৩২ শতাংশ ব্যয় করে চাউল কেনায়। আবার গরীব মানুষেরা ধনীদের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করে চাউল কিনতে। তবে গ্রাম ও শহর উভয় এলাকার গরীব মানুষের কাছে লাক্সাজিয়াস বা বিলাসী খাদ্য পণ্য হিসেবে পরিগনিত হয় মাংস, মাছ ও ফল। তবে ডিম সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য খাবার। মাংস কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে শহরের মানুষ। ফল কেনায় এগিয়ে ধনীরা। তবে শাক ও সবজি কেনার ক্ষেত্রে গ্রাম শহর সবজায়গায়ই প্রায় সমান। দরিদ্র্য মানুষের সবচেয়ে কম ব্যয় করে ফল ও পুষ্টিকর খাবারের পেছনে। তবে পরিবার প্রধান যদি নারী হয় তাহলে কিছুটা পুষ্টিকর খাবাওে গুরুত্ব থাকে। সেই সঙ্গে বিড়ি,সিগারেট,পান,জদ্দা কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ কম হয়। তবে মানুষের যদি ১০ শতাংশ আয় বাড়ে তাহলে ১৫ শতাংশ ভোগ বেড়ে যায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যদি চালের দাম বাড়ে তাহলে জাতীয়ভাবে ডাল জাতীয় খাবার, মাছ, মাংস ফল এবং অন্যান্য খাদ্য পণ্যেও ভোগ কমে যায়। এক্ষেত্রে শুধু শাক-সবজি কিনে থাকে দরিদ্র মানুষেরা। যদি ডাল জাতীয় খাদ্য পণ্যের দাম বেড়ে যায় তাহলে অন্যান্য খাদ্য পণ্য এবং মাছের ভোগ কমে যায়। এক্ষেত্রে বেড়ে যায় চাউল, ডিম এবং সবজি ক্রয়ের পরিমাাণ। মাছের দাম বাড়লে চাউল, মাংস, সবজি এবং অন্যান্য খাদ্যেও ভোগ কমে যায়। অন্যদিকে বেড়ে যায় ফল এবং ডাল জাতীয় খাদ্য ক্রয়। ডিমের দাম বাড়লে মাছ ও মাংসের ভোগ কমে যয়, বেড়ে যায় চাউল, অন্যান্য খাদ্য, ডাল জাতীয় খাদ্য,সবজি এবং ফলের ভোগ। সবজির দাম বাড়লে চাউল, ডিম, মাংস এবং ফলের ভোগ করে। বেড়ে যায় অন্যান্য খাদ্য পণ্য, ডাল এবং মাছের ভোগ। ফলের দাম বাড়লে চাউল,ডাল, সবজি এবং অন্যান্য খাদ্য পণ্যেও ভোগ কমে যায়, এদিকে বেড়ে যায় মাছ ও মাংসের ভোগ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, করোনা মহামারীর সময় যখন প্রথম লকডাউন হয় ১১ শতাংশ দাম বেড়ে যায় বিভিন্ন পণ্যের। এসময় জাতীয়ভাবে আয় কমে যায় ৭০ শতাংশ। দ্বিতীয় লকডাউনের সময় পণ্য মূল্য বেড়ে যায় ২০ শতাংশ। সেই সঙ্গে আয় পুনরুদ্ধার হয়ে ৪৩ শতাংশ কম থাকে। তৃতীয় লকডাউনের সময় পন্য মূল্য বেড়ে যায় ১৬ শতাংশ। সেই সঙ্গে আয় পুন:রুদ্ধারের ধারা অব্যাহত থাকে। আয় কম হয় ৪ শতাংশ।

গবেষণার সুপারিশে বলা হয়, যেহেতু চালের দাম বাড়লে গরীব মানুষের পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ বাদ দেয় সেহেতু সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসুচী বাড়াতে হবে। পাশাপাশি খোলা বাজারে চাল বিক্রি বাড়িয়ে দিতে হবে। এছাড়া যখন আয় কমে যাবে তখন আয় বর্ধক মূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা দরকার।

অনুষ্ঠানে ড. বিনায়ক সেন বলেন, গরীব মানুষেরা চাল নির্ভর থাকে। কারণ তাদের আয় কম থাকে। দাম বাড়লে ডিমের ভোগ ঠিক থাকলেও মাছ,মাংস, ফল এবং সবজির ভোগ কমিয়ে দেয়। এটা জাতিগত ভাবে আমাদের জন্য বড় ক্ষতি। গবেষণাটি পুরনো তথ্য দিয়ে করা হলেও এখনও এমন পরিস্থিতির আশংকা আছে। তবে এই অবস্থার সঙ্গে দেখা দরকার ভারত,পাকিস্তান এবং নেপালের অভ্যাস বা খাদ্য গ্রহণের অবস্থা কেমন।

তিনি বলেন, গবেষণায় আরেকটি বিষয় ওঠে এসছে সেটা হলো করোনার কারণে আয় কমে যাওয়ার পরিমাণ ৭০ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নেমে আসে। তিনি বলেন, করোনার শেষের দিকে মানুষের আয়ে একটি পুনরুদ্ধার ঘটেছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক প্রশ্নে জবাবে গবেষক ওয়াসেল বলেন, অনেক সময় বলা হয় যে মুরগীর দাম বেড়ে গেলে মানুষ মাছ খাবে বেশি কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। মাছের দাম বাড়লে ফল ও ডালের ভোগ বাড়বে। আবার মাংসের দাম বাড়লে সব কিছুর ভোগ কমে আসবে।

তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে সরকারের নীতি সহায়তা বাড়াতে হবে। চালের দাম বাড়লে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। আর মাছ মাংসের মতো পণ্যের দাম বাড়লে জনগণের আয় বাড়াতে হবে বলে পরামর্শ দেন বিআইডিএসের এই গবেষক।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com