August 17, 2026, 5:01 pm
সাধারণ মানুষের কাছে টাকা পয়সা রাখার একটি আস্থার জায়গা ইসলামী ব্যাংকগুলো। সেই ব্যাংক থেকেই জনগণের কষ্টের আমানতের ৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে নাবিল’ গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এদিকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে মানা হয়নি কোন ধরনের নিয়মনীতি। রাখা হয়নি জামানত। মাত্র ছয় মাসে গ্রুপটিকে বিশাল অঙ্কের এ ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড।
ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড চার হাজার ৫০ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এক হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এক হাজার ১২০ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে।
নাবিল গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানকেই এককভাবে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৯৫০ কোটি টাকা। এসব ঋণের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ বা ব্যয় করা হবে তারও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই কারও কাছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) রিপোর্ট অনুযায়ী, এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থেকে নাবিল গ্রুপ ঋণ নিয়েছিল মাত্র সাড়ে আট লাখ টাকা। এরপরই নেওয়া হয় ছয় হাজার ৩৭০ কোটি টাকার ঋণ। বিশাল অঙ্কের এ ঋণের অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতা তাদের আছে কি না, ঋণ দেওয়ার আগে তা যাচাই করেনি ব্যাংকগুলো— বলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন।
এছাড়া একই গ্রুপের নামে বিশাল অঙ্কের এ ঋণ ব্যাংক কোম্পানি আইনে থাকা একক গ্রাহকের অনুকূলে দেওয়া ঋণ সীমার (সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার লিমিট) চেয়ে বেশি। এসব বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা, নতুন প্রতিষ্ঠানটিকে বিশাল অঙ্কের ঋণ সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে ব্যাংকগুলোর পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা নামে-বেনামের প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তিন ব্যাংকের মোট অনুমোদিত ঋণ (ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পরিভাষায় বিনিয়োগ) ছয় হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। চলতি বছর (২০২২ সাল) ছয় মাসের ব্যবধানে এসব ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের রাজশাহী শাখা নাবিল ফিড মিলস ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে তিন হাজার ১০০ কোটি টাকার ঋণ দেয়। যা চলতি বছরের ২১ মার্চ ব্যাংকের ৩০৮তম বোর্ড সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্যাংকটির গুলশান শাখা নাবিল গ্রেইন ক্রপসের নামে অনুমোদন দেয় ৯৫০ কোটি টাকার ঋণ।
চলতি বছরের ২৩ জুন ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ২৪৬তম বোর্ড সভায় নাবিল নব ফুড ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান, নাবিল ফিড মিলস এবং শিমুল এন্টারপ্রাইজের নামে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়। একই বছরের ৩০ মে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৪৮১তম বোর্ড সভায় গুলশান শাখা থেকে নাবিল নব ফুড ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান, নাবিল ফিড মিলস এবং শিমুল এন্টারপ্রাইজের নামে এক হাজার ১২০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়।
সবমিলিয়ে তিন ব্যাংকের কাছে ভুঁইফোড় গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখার গ্রাহক নাবিল ফুডসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নাবিল ফিড ও শিমুল এন্টারপ্রাইজের নামে এক হাজার ১২০ কোটি টাকার ঋণ দেয়। এর মধ্যে ফান্ডেড (নগদ) ৪৫০ কোটি এবং নন-ফান্ডেড (এলসি ও ব্যাংক গ্যারান্টি) ৬৭০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ সীমা নতুনভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু কোন খাতে এ টাকা ব্যবহার হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।
কোন বিবেচনায় নতুন একজন গ্রাহককে বিশাল অঙ্কের এ ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে তা যাচাই করা জরুরি— বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি বলছে, এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে- ফোর্সড (বাধ্যতামূলক) ঋণ আদায় অগ্রগতি অবহিত করা, কোন বিবেচনায় এ ঋণ দেওয়া হলো তার ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত কাগজপত্র জমা দেওয়া।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এত বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে কোনো জামানতের নেওয়া হয়নি। তিন মাসে এলসি কমিশন মাত্র দশমিক ১৫ শতাংশ। গ্যারান্টির ক্ষেত্রে নাবিল ফার্মের কর্পোরেট গ্যারান্টি গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৪৮১তম বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদন দেওয়া হলেও ৪৮২ ও ৪৮৩তম সভায় শর্ত শিথিল করা হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গ্যারান্টির ক্ষেত্রে সব পরিচালক এবং তাদের স্বামী ও স্ত্রীরা গ্যারান্টার ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে শর্ত শিথিল করে শুধুমাত্র পরিচালকদের গ্যারান্টার করা হয়।
আমানত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল, নিজ নামে অথবা রেফারেন্সে অন্যদের নামে প্রাথমিকভাবে ২০০ কোটি এবং পরবর্তীতে আমানত ৬০০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে হবে। কিন্তু পরে তা শিথিল করে বলা হয়, পর্যাপ্ত আমানত রাখতে হবে। এ বিষয়ে তেমন কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, একটি নতুন ঋণের ক্ষেত্রে কোন বিবেচনায় শর্ত শিথিল করা হলো তা জানা জরুরি। এছাড়া গ্রাহক বেনামে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলশান শাখার নতুন গ্রাহক নাবিল গ্রেইন ক্রপসের অনুকূলে ৯৫০ কোটি টাকা নন-ফান্ডেড ঋণ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে এ ঋণের বিপরীতে ২৩০ কোটি টাকা জামানত রাখার কথা। কিন্তু ঋণের শর্তে ১১০ কোটি টাকার আমানত অথবা লিয়েন থাকার কথা বলা হয়েছে। এক জায়গায় বলা আছে, কৃষিপণ্য আমদানি ও বিপণনের জন্য এ অর্থ ব্যবহার হবে। কিন্তু সর্বশেষ সিআইবি প্রতিবেদন অনুসারে, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের মোট এক্সপোজার মাত্র সাড়ে আট লাখ টাকা।
প্রকল্পঋণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গ্রাহক একেবারে নতুন। সম্পূর্ণ নতুন একজন গ্রাহককে বাণিজ্যের জন্য বিশাল অঙ্কের এ ঋণ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকের বড় ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার সক্ষমতা আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এছাড়া নাবিল ফিড মিলসের নামে নতুন করে ৭০০ কোটি টাকাসহ মোট তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহী শাখা। কিন্তু নাবিল গ্রেইন ক্রপস কোনো গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্দেহ, এটি ওই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। ফলে একক কোনো গ্রুপকে ঋণ দেওয়ার যে আইন রয়েছে, এটি তার লঙ্ঘন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো ব্যাংক একক কোনো প্রতিষ্ঠানকে ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে তার পরিশোধিত মূলধনের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। এর মধ্যে ফান্ডেড ১৫ শতাংশ এবং নন-ফান্ডেড ২০ শতাংশ। বর্তমানে ওই তিন ব্যাংকের মোট পরিশোধিত মূলধন তিন হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে নাবিল গ্রুপকে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। কিন্তু দেওয়া হয়েছে তার প্রায় পাঁচগুণ।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, একটি নতুন গ্রুপকে বিশাল অঙ্কের টাকা দেওয়া মানে, ব্যাংক খাতে সুশাসনের বড় ধরনের অভাব পরিলক্ষিত হওয়া। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব কাজ করে থাকে ব্যাংকের বোর্ডের কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্ট লোক। তারা ঋণ বের করে পরে আর ফেরত দিতে পারেন না, খেলাপি হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতি হয় ব্যাংক আর আমানতকারীরা।
‘এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। এখন যেটা করা উচিত, এসব ঋণ শক্তভাবে মনিটরিং করা। ঋণের টাকা যেখানে বিনিয়োগ হবে সেখান থেকে অর্থ ফেরত আসবে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে বিষয়গুলো তদারকি করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এভাবে ঋণ চলে গেলে অর্থ আর ফেরত আসে না। অতীতের রেকর্ড এটি বলে।’
বিষয়গুলো তদন্ত করা এবং বোর্ডের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের সরিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এখনই পদক্ষেপ নিতে না পারলে পরবর্তীতে বিপদে পড়া লাগতে পারে— আশঙ্কা এ অর্থনীতিবিদের।
এ বিষয়ে জানতে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এদিকে এ বিষয়ে তিন ব্যাংকের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা যায়, নাবিল গ্রুপের ১৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নাবিল নব ফুড, ফ্লাওয়ার মিল, ফিডমিল, অটোরাইস মিল, ডাল মিল, কনজ্যুমার প্রডাক্ট, নাবিল ফার্ম, ক্যাটল ফার্ম ও নাবিল ট্রান্সপোর্ট। তবে, ওয়েবসাইটে প্রোডাক্ট অপশনে মাত্র ছয়টি পণ্যের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো- চাল, আটা, ময়দা, সুজি, ডাল ও পশুখাদ্য।
কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন মো. জাহান বক্স মন্ডল। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলাম, পরিচালক ইসরাত জাহান এবং উপ-পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ