October 13, 2026, 11:41 pm
করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় টাকার অব্যাহত দরপতনে ওলটপালট হয়ে যাওয়া অর্থনীতিতে একটি সুখবর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর সুখবরটি হচ্ছে দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠে ২০২১-২২ অর্থবছর শেষ হয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধি সাড়ে তিন বছরের মধ্যে (৪৩ মাস) সবচেয়ে বেশি।
গত ৩০ জুন নতুন মুদ্রানীতি (২০২২-২৩) ঘোষণার সময় সাবেক গভর্নর ফজলে কবির বলেছিলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হবে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।
কিন্তু বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো নিয়ে হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, জুন মাসে গত বছরের জুনের চেয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
তবে এতে আমেরিকার মুদ্রা ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনের অবদান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। তারা বলেছেন, দেশের বাজারে ডলারের দাম বাড়ার কারণে গ্রাহককে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়েছে। আর এটি বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, টানা আট মাস ধরে বাড়তে বাড়তে ২০২২ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকটি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে ১১ দশমিক ০৭ শতাংশে উঠেছিল।
তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় ফেব্রুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি কমে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে আসে। মার্চে তা দশমিক ৫৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১১ দশমিক ২৯ শতাংশে ওঠে। এপ্রিল মাসে তা ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশে ওঠে। মে মাসে তা আরও বেড়ে ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ ওঠে।
সবশেষ জুন মাসে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছে।
এর অর্থ হলো ২০২১ সালের জুন মাসের চেয়ে এই বছরের জুন মাসে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি ঋণ পেয়েছেন।
এরপরও মুদ্রানীতিতে যে লক্ষ্য ধরা হয়েছিল, তার থেকে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ পয়েন্ট কম নিয়েই শেষ হয়েছে অর্থবছর।
২০২১-২২ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।
গ ত বছরের জুন শেষে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। এরপর থেকেই কমতে থাকে এই সূচক।
বেসরকারি ঋণে ১৩.৬৬% প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হলো অর্থবছর
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দিাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৫১ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালের জুন শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৯৭ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা।
এ হিসাবেই ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
অর্থনীতির বিশ্লেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছিল। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার যে প্রণোদণা ঘোষণা করেছিল, তাতে এর অবদান ছিল। এছাড়া করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় দেশে বিনিয়োগের একটি অনুকুল পরিবেশও দেখা দিয়েছিল। পদ্মা সেতু, মেট্টোরেল, বঙ্গবন্ধু কর্ণফূলী টানেলসহ কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে উদ্যোক্তারা নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে বিনিয়োগে নেমেছেন। ব্যাংকগুলো তাতেও বিনিয়োগ করছে।’
‘সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণের একটি গতি এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারণে আমদানিকারকদের এলসি খুলতে বেশি টাকা লেগেছে। তাতেও ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে।’
‘তবে আর নয়। এখন যে করেই হোক টাকাকে শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দ্রুত এটা করতে হবে। এখন আর নয়-ছয় নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। রাশিয়া যেমন ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে তাদের রুবলকে শক্তিশালী করেছে আমাদেরও তাই করতে হবে। মতো
আহসান মনসুর বলেন, ‘ডলারের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন আমাদের অর্থনীতিকে প্রতি মুহূর্তে তছনছ করে দিচ্ছে। বড় ধরনের সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে আমাদের। আমদানি কমাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। ডলার ছুটছে তো ছুটছেই। এখন আমাদের সামনে একটাই পথ খোলা আছে, সুদের হার কমানো। আর সেটা এখনই করতে হবে।’
মহামারি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় আমদানি বাড়তে থাকায় আগস্ট থেকে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে; দুর্বল হতে থাকে টাকা। এখনও সেটা অব্যাহত আছে। তার আগে এক বছরেরও বেশি সময় ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় ‘স্থির’ ছিল ডলারের দর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত এক বছরে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে (ব্যাংক রেট) টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর ব্যাংক ও কার্ব মার্কেটে বেড়েছে ৩০ শতাংশের মতো।