October 14, 2026, 12:26 am

অর্থনীতিকে চাপমুক্ত করছে রেমিট্যান্স

অর্থনীতিকে চাপমুক্ত করছে রেমিট্যান্স

রিজার্ভ দুই বছরের মধ্যে ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার পর যে চাপ দেখা দিয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের আশা তৈরি হয়েছে প্রবাসী আয়ের হাত ধরে।

গত জুনে সমাপ্ত অর্থবছরে রেমিট্যান্স আগের বছরের তুলনায় অনেকখানি কমে যাওয়া নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হলেও নতুন অর্থবছরে রীতিমতো জোয়ার তৈরি হয়েছে।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের ২৮ দিনেই প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক গত বছরের জুলাই মাসের পুরো সময়ের চেয়েও ৫ শতাংশ বেশি।

বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা) হিসাবে টাকার অঙ্কে ২৮ দিনের রেমিট্যান্সের অর্থের পরিমাণ ১৯ হাজার কোটি টাকার মতো।

তবে বাজারে ডলারের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ব্যাংকগুলো ১০৪-১০৫ টাকা দরেও রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছে। সে হিসাবে ২৮ দিনের রেমিট্যান্সের অঙ্ক আরও বেশি।

মাসের বাকি তিন দিনের রেমিট্যান্স যোগ হলে জুলাইয়ের মোট রেমিট্যান্স ২২০ কোটি (২.২০ বিলিয়ন) ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে আশার কথা শুনিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে অর্থনীতি নিয়ে যখন নানা হতাশার তথ্য সে সময় রেমিট্যান্সের উল্লম্ফন অব্যাহত থাকলে এই অর্থবছরে নতুন রেকর্ডের পাশাপাশি দেশ অনেকটাই চাপমুক্ত হবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সাধারণত দুই ঈদের আগে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়ে, ঈদের পর কমে যায়। তবে এবার কোরবানির ঈদের আগে যে গতিতে রেমিট্যান্স এসেছে, সেই ধারা ঈদের পরও অব্যাহত আছে। এটিও আরেক ইতিবাচক দিক।

এই প্রবণতা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং এই অর্থবছরে নতুন রেকর্ড তৈরি হবে বলে মনে করছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ১ জুলাই শুরু হওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ২৮ দিনে ১৯৬ কোটি (১.৯৬ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এ হিসাবে প্রতিদিন ৭ কোটি ডলার করে পাঠিয়েছেন তারা; টাকার হিসাবে প্রতিদিন দেশে এসেছে ৬৬৩ কোটি টাকা।

৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে মন্দা দেখা দেয়। পুরো অর্থবছরে ২ হাজার ১০৩ কোটি (২১.০৩ বিলিয়ন) ডলার এসেছিল; ওই বছর গড়ে প্রতিদিন ৫ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন ঘটে ২০২০-২১ অর্থবছরে। সে সময়ে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি (২৪.৭৮ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। ওই অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে ৬ কোটি ৭৯ ডলার প্রবাসী আয় হিসেবে দেশে এসেছিল।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ লোক কাজের সন্ধানে বিভিন্ন দেশে গেছেন। তারা ইতোমধ্যে অর্থ পাঠাতে শুরু করেছেন। সে কারণেই ঈদের পরও রেমিট্যান্স বাড়ছে। এই ইতিবাচক ধারা বছরজুড়েই অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করছি।’

দেশে গত ১০ জুলাই কোরবানির ঈদ উদযাপিত হয়। ঈদের আগে রেমিট্যান্সপ্রবাহে ঢল নামে। ঈদের ৯০ কোটি ৯৩ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ঈদের পরে ১৮ দিনে আসে ১০৫ কোটি ডলারের কিছু বেশি।

ঈদের পরও রেমিট্যান্স বাড়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েক মাসে ডলারের দর বেশ খানিকটা বেড়েছে। প্রণোদনার পরিমাণ ২ শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশ করা হয়েছে। এসব কারণে প্রবাসীরা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। সে কারণেই বাড়ছে রেমিট্যান্স।’

তিনি বলেন, ‘এই সময়ে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির খুবই দরকার ছিল। নানা পদক্ষেপের কারণে আমদানি ব্যয় কমতে শুরু করেছে। রপ্তানির পাশাপাশি রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে আশা করছি এখন মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।’

আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে রোববার প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো ১০৪-১০৫ টাকা দরে প্রবাসীদের কাছ থেকে ডলার সংগ্রহ করায় প্রবাসীরা হুন্ডিতে আগ্রহী হচ্ছেন না সেভাবে। এর কারণ এই দরের সঙ্গে নগদ প্রণোদনার ২ টাকা ৫০ পয়সা যুক্ত হয়ে ১০৭ টাকা ৫০ পয়সা পাচ্ছেন। কার্ব মার্কেট বা খোলাবাজারের ডলারের দরও একই।

রেমিট্যান্স বাড়ার আরেকটি কারণের কথা বলেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতি চাঙা হয়েছে। সেখানে কর্মরত আমাদের প্রবাসীরা বেশি আয় করছেন। দেশেও বেশি টাকা পাঠাতে পারছেন।

‘দেশে ডলারের সংকট চলছে। মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা চলছে। রিজার্ভ কমছে। এই মুহূর্তে রেমিট্যান্স বাড়া অর্থনীতির জন্য খুবই ভালো হবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ও তেমন পূর্বাভাস দিয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরজুড়ে (২০২১-২২) ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে থাকা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে নতুন অর্থবছরে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে।

এই পূর্বানুমানের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শ্রমিক নতুন করে বিদেশে যাওয়ায় তাদের কাছ থেকে বাড়তি পরিমাণ রেমিট্যান্স পাওয়া যাবে।’

দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর হালচাল নিয়ে তৈরি করা পাক্ষিক প্রতিবেদনেও রেমিট্যান্স নিয়ে সুসংবাদের আভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে বলা হয়, রেমিট্যান্স ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং চলতি অর্থবছরে গত বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি আসবে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com