July 27, 2026, 11:10 am

পেটে কাঁচি রেখেই অপারেশন সম্পন্ন, ফরিদপুরে তোলপাড়

পেটে কাঁচি রেখেই অপারেশন সম্পন্ন, ফরিদপুরে তোলপাড়

পেটে কাঁচি রেখেই অপারেশন সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অপারেশনের দেড় বছর পর এক্সরের মাধ্যমে চিকিৎসকরা পেটের ভেতরে কাঁচিটি দেখতে পান।

আর এ দেড় বছরেরও বেশি সময় পেটের অসহনীয় যন্ত্রণাভোগের পর এখন মৃত্যুর পথযাত্রী মনিরা খাতুন (১৭) নামে এক কিশোরী। এ দীর্ঘ সময় সে শরীর সোজা করে দাঁড়াতেই পারেননি। গত দু’তিনদিনে তার অবস্থা মুমূর্ষু পর্যায়ে পৌঁছানোর পর এক্সরে করলে পেটের ভেতর কাঁচি থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে।

বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অদ্ভুত পরিস্থিতিতে জরুরিভিত্তিতে অপারেশন করে মনিরার পেট থেকে কাঁচি বের করার আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনিরার বাবার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরের বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের ঝুটি গ্রামে। বাবার নাম খাইরুল মিয়া।

ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাড়পত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২০২০ সালের ৩ মার্চ তলপেটে ব্যথা নিয়ে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয় মনিরা। মেসেনটেরিক সিস্ট অপারেশনের জন্য হাসপাতালের নারী সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ৯ মার্চ পর্যন্ত। এসময়ের মধ্যে তার অপারেশন করা হয়।

জানা গেছে, এ সার্জিক্যাল অপারেশনের পরেও মনিরার পেটের ব্যথা থেকে যায়। এরমধ্যেই অপারেশনের ক’দিন পর মনিরার বিয়ে দেওয়া হয় নগরকান্দার কল্যাণপট্টি গ্রামে। পেটে ব্যথার কারণে স্বামীর ঘরেও ভালোভাবে থাকতে পারেননি তিনি। ব্যথানাশক ওষুধ ও পল্লী চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে চলছিল তার চিকিৎসা। তবে একপর্যায়ে অসুস্থতার কারণে স্বামীর পরিবারের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। এর মাঝে গর্ভের একটি সন্তানও নষ্ট হয়ে যায়। একমাস আগে তাকে বাপের বাড়ি রেখে আসে স্বামী।

গত বৃহস্পতিবার (৯ ডিসেম্বর) মনিরাকে নিয়ে তার অভিভাবকেরা চিচিৎসক দেখাতে যায় মুকমুদপুর উপজেলা সদরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সিটিল্যাব নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে এক্সরে করার পর পেটের মধ্যে কাঁচি থাকার বিষয়টি পরিস্কারভাবে ধরা পড়ে।

নিশ্চিত হওয়ার জন্য এ বিষয়ে মুকসুদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন চিকিৎসেরক সঙ্গে আলাপ করা হলে নামপ্রকাশ না করার শর্তে তারা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তারা বলেন, আমাদের সন্দেহ হলে তাকে একটি এক্সরে করতে বলি। এক্সরে রিপোর্টে কাঁচি দেখা যায়। গত ৩ মার্চ ২০২০ সালে একটি অপারেশনের সময় ভুলে তার পেটের ভেতরে এ কাঁচিটি রেখে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলেছেন, মনিরার পেটে দীর্ঘদিন থাকা ওই কাঁচির হাতলে সামান্য মরিচা ধরেছে এবং পেটের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। দ্রুত অপারেশন করে কাঁচিটি বের করা না হলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

তবে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মনিরার পরিবারের কেউ। তার ভাই কাইয়ুম মিয়ার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। শহিদুল ইসলাম নামে মনিরার এক আত্মীয় (খালু) জানান, আর্থিক সমস্যার কারণে মনিরার অপারেশন করাতে দেরি হবে।

এ ব্যাপারে জানতে ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জিক্যাল বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তারা কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে, নামপ্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক বলেন, তিনি শিক্ষানবিস চিকিৎসকদের কাছ হতে ঘটনাটি শুনেছেন। মেয়েটিকে এ হাসপাতালে আনা হলে আমরা তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেবো।

এ ব্যাপারে জানতে পক্ষ থেকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে সরাসরি ও মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি।

শুক্রবার (১০ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে আটটার দিকে ফরিদপুরের নূর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দ্বিতীয় বারের মতো অপারেশন চেষ্টা চালানো হয় এবং তার পেটে কাঁচি দেখতে পাওয়া যায়। এদিকে, কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে মনিরার অভিভাবকরা ফরিদপুর পুলিশ সুপারের শরণাপন্ন হন এবং বিষয়টি বিস্তারিত খুলে বলেন।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলিমুজ্জামান বলেন, রোগীর পরিবারটি অসহায়। তারা আমার কাছে এসেছিলেন। তাদের কথা বিস্তারিত জেনে আগে রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আগে রোগীর ভালোভাবে চিকিৎসাটা হোক, তার সুস্থতা কামনা করি। এর পর রোগী ও তার পরিবারের কোনো অভিযোগ দায়ের করলে বিষয়টি দেখা যাবে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com