October 13, 2026, 4:02 pm

প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ছক ডেসকোর

প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ছক ডেসকোর

মুত্তাকিনুর রহমান: ঢাকা এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করতে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ২ হাজার ৩৫৭ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ১ হাজার ২৭৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ডেসকোর নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেবে ৬১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর বাকি ৪৬৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা সরকার দেবে। কিন্তু প্রকল্পটিতে বিদেশে প্রশিক্ষণ, পাঁচগুণ বেশি দামে খাম্বা কেনা, দ্বিগুন দামে কেবল কেনাসহ বিভিন্ন ক্রয়ের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে।যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ছক করেছে ডেসকো।

ডেসকোর এই প্রকল্পটিতে কেনাকাটায় অস্বাভাবিক দাম প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশন বলছে, প্রকল্পটিতে প্রস্তাবিত ব্যয় চলমান সমজাতীয় অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় আড়াই থেকে ৩১ শতাংশ বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সংশ্লিষ্ট ধাতুর দাম কমছে তাই বিভিন্ন পণ্যের কেনাকাটায় দাম কমবে।

বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পটিতে ১০ কর্মকর্তাকে বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠাতে চার কোটি ৭৫ লাখ টাকা চেয়েছে ডেসকো। এ হিসাবে ওই প্রশিক্ষণে জনপ্রতি ব্যয় হবে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ একই প্রকল্পে ২০ জনের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ জনপ্রতি মাত্র ২০ হাজার টাকা। এ হিসাবে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে একজনের জন্য অর্থ ব্যয় হবে দেশি প্রশিক্ষণের প্রায় ২৩৮ গুণ। অথচ এ প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছে স্বয়ং পরিকল্পনা কমিশন।

এ ছাড়া বর্তমানে করোনা মহামারি বিবেচনায় নিয়ে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাদ দিয়ে দেশেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলেছে কমিশন। সে অনুযায়ী ডেসকোকে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) শরিফা খান বিজনেস নিউজকে বলেন, আমরা তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের বিষয়টি বাদ দেওয়ার জন্য বলেছি। এগুলো তো তাদের নিয়মিত কাজ। এতদিন ধরে যদি এগুলো নাই শিখতে পারে তাহলে আমাদের কী ক্যাপাসিটি হলো। যেহেতু পরামর্শক ব্যয় রাখা হয়েছে তাহলে পরামর্শকের সঙ্গে টেন্ডারে তখন ওইভাবে লিখে নেবে যে কমিশনিং, এটা কীভাবে রান করবে, অপারেশন, ইনস্টলেশন সব দেখিয়ে দিয়ে যাবে। এটা আমাদের কর্মকর্তারা শিখে নেবে।

প্রকল্পটির কেনাকাটা প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পটিতে ৬ হাজার ৭০০টি বৈদ্যুতিক খুঁটির (খাম্বা) দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এতে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি কিনতে খরচ ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার ৩৯০ টাকা। অথচ ডেসকোর কর্মকর্তা নিজেই সম্প্রতি ২০ হাজার টাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি কেনার কথা জানিয়েছেন।

বৈদ্যুতিক খুঁটি কেনার বিষয়ে ডেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান বিজনেস নিউজকে বলেন, আমরা এসপিছি এইচটি পোলগুলো এর আগে ১৯ হাজার ৮০০ টাকায় কিনেছি। এলটি পোলগুলো আরও কম হবে বলে তিনি জানান। তবে এগুলোর দাম বেড়েছে উল্লেখ করে বৈদ্যুতিক পোল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, এসপিছি পোলগুলো সাইজভেদে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর স্টিল পোলগুলোর দাম ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। করোনার কারণে দাম কিছুটা বেড়েছে। এদিকে সম্প্রতি এক প্রকল্পে ১৪ হাজার টাকা করে এসপিসি পোল কেনা হয়েছে। সে অনুযায়ী ১৪ হাজার টাকার পোল ৬৬ হাজার টাকায় কিনবে ডেসকো।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) শরিফা খান বিজনেস নিউজকে বলেন, প্রকল্পটিতে বেশ কিছু পণ্যেই দাম বেশি ধরা হয়েছে। আমরা কমানোর জন্য বলেছি। আমরা অনেক টেকনিক্যাল বিষয় না বোঝার কারণে সমজাতীয় প্রকল্পগুলোর সঙ্গে তুলনা করি। বেশি হলে কমানোর জন্য বলি।

প্রকল্পটিতে ৮২০টি দুই ধরনের বিতরণ ট্রান্সফরমার ও ১০০টি রিং মেইন ইউনিট (আরএমইউ) কিনতে ৬৫ কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। এখানে গড়ে একেকটির দাম পড়ছে ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা। অথচ ভারত ও চীনের বেশ কিছু অনলাইন সাইট ঘুরে দেখা যায় একটি আরএমইউর দাম আড়াই লাখ টাকার বেশি নয়।

এদিকে জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা ২৫০ কেভিএ বিতরণ ট্রান্সফরমার ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। আর ২৫ কেভিএ বিতরণ ট্রান্সফরমারের দাম ৩ লাখ টাকার বেশি হবে না বলে জানা যায়।

প্রকল্পটিতে ১০০ কিলোমিটার ১১ কেভি (১ কোর*৩০০ মিমি) ভূগর্ভস্থ কপার কেবল কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৮ কোটি ৯৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। প্রতি মিটার কেবল কিনতে ব্যয় পড়ে ১০ হাজার ৮৯০ টাকা। অথচ একই কেবল প্রতি মিটার ৬ হাজার ১১২ টাকা দরে বিক্রি করছে দেশের সুপরিচিতি তার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বিআরবি কেবলস। এখানেও প্রতি মিটার কেবল কিনতে প্রায় ৫ হাজার টাকা অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ দাম বেশি দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া ১৫০ কিলোমিটার ৩৩ কেভি ৫০ সার্কিট (১ কোর*৫০০ মিমি) ভূগর্ভস্থ কপার কেবল কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮ কোটি ৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। প্রতি মিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮৭০ টাকা। আর ৭০টি ট্রান্সফরমার সুরক্ষা সরঞ্জাম ও ক্যাপাসিটার ব্যাংক কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এতে প্রতিটির দাম পড়ে ৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯৭০ টাকা।

বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিমানবন্দর, বসুন্ধরা, কালশি ও টঙ্গীতে ‘টানকি’ ভিত্তিতে ৪টি ১৩৩/৩৩/১১ কেভি জিআইএস গ্রিড সাবস্টেশন সরবরাহ, স্থাপন ও চালু করতে ৬২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। আর কালাচাঁদপুর, পূর্বাচল, মিরপুর ও উত্তরা রূপায়ণ সিটিতে টানকিভিত্তিতে ৪টি ৩৩/১১ কেভি জিআইএস বিতরণ সাবস্টেশন সরবরাহ, স্থাপন ও চালু করতে ১৪৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

তবে প্রকল্প প্রস্তাবে পণ্যের দাম বেশি ধরা হয়েছে- এ কথা কোনোভাবেই মানতে নারাজ ডেসকোর প্রধান প্রকৌশলী জুলফিকার তাহমিদ। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, করোনার কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। কোনো পণ্যের দামই বেশি ধরা হয়নি। আর এটা কেনাকাটায় ওপেন টেন্ডার হবে।

প্রকল্পে পণ্যের দাম বেশি ধরার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বিজনেস নিউজকে বলেন, এ ধরনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর একটি লক্ষ্য থাকে যে, তারা বাজেট বেশি প্রস্তাব করলে কমিশন তা কমাবেই। এ ভেবে তারা অনেক সময় বেশি প্রস্তাব করে। তবে বেশি প্রস্তাব দেওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে বেশি বরাদ্দ নেওয়া। যদি বেশি বরাদ্দ নিতে পারে তা হলে দেখা যায়, এখান থেকে একটা ফায়দা হাসিলেরও সুযোগ থাকে তাদের। এটাও একটা উদ্দেশ্য।

বিজনেস নিউজ/এসআর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com