October 10, 2026, 8:59 pm

২০১০ সালের মহাধসের পর সবচেয়ে ভালো অবস্থানে পুঁজিবাজার

২০১০ সালের মহাধসের পর সবচেয়ে ভালো অবস্থানে পুঁজিবাজার

২০১০ সালের মহাধসের পর ধুঁকতে থাকা শেয়ারবাজার সম্প্রতি বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত মূল্য সূচক বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম। এতে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের অর্থের পরিমাণ। এ পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারের কোটিপতি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজারের ওপরে। এর মধ্যে ১০ কোটি টাকার ওপরে বিনিয়োগ রয়েছে এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা হাজারের ওপরে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রায় দেড় মাস ধরে শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে। এ সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক বেড়েছে প্রায় আটশ পয়েন্ট। লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে তিনগুণ। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপরে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে শেয়ারবাজার বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

তার আগে মহামারি করোনাভাইরাস আতঙ্কে ২০২০ সালের মার্চে বড় ধরনের ধস নামে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় টানা ৬৬ দিন বন্ধ রাখা হয় শেয়ারবাজারের লেনদেন। এর মধ্যেই বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেব যোগ দেন আরও তিনজন। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর শেয়ারবাজারে লেনদেন চালু করার উদ্যোগ নেন তারা। ফলে টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর গত বছরের ৩১ মে থেকে শেয়ারবাজারে আবার লেনদেন চালু হয়।

নতুন নেতৃত্বের অধীনে শেয়ারবাজারে লেনদেন চালু হলেও অব্যাহত থাকে লেনদেন খরা। তবে জুলাই মাসে এসে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেয় নতুন কমিশন। অনিয়মে জড়িত থাকায় একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়। সতর্ক করা হয় সরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি)।

সেই সঙ্গে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসকে জরিমানার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইসিবিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। বাতিল করা হয় এক ডজন দুর্বল কোম্পানির আইপিও। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ ধরনের একের পর এক পদক্ষেপের ফলে ঘুরে দাঁড়ায় শেয়ারবাজার। ৫০ কোটি টাকার নিচে নেমে যাওয়া লেনদেন হাজার কোটি টাকার ওপরে হওয়া অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়।

তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে বাজারে। আবারও করোনার সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেলে মার্চের শেষ ও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ এক প্রকার ধস নামে শেয়ারবাজারে। অবশ্য কয়েকদিন পরে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘লকডাউন’ দিলেও শেয়ারবাজার বেশ তেজী হয়ে ওঠে। আতঙ্ক কাটিয়ে লকডাউনের মধ্যে হু হু করে বাড়ে লেনদেন, সূচক ও বাজার মূলধন। এতে বিনিয়োগকারীদের মুখেও হাসি ফুটেছে।

গত ৫ এপ্রিল লকডাউন শুরু হওয়ার আগে ৪ এপ্রিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল সূচক ছিল পাঁচ হাজার ৮৮ পয়েন্টে। ২৫ মে লেনদেন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৮৮৪ পয়েন্ট। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক বেড়েছে ৭৯৬ পয়েন্ট। বাজার মূলধন বেড়েছে ৫৫ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। ৪ এপ্রিল ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল চার লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২৫ মে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৯৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

সূচক ও বাজার মূলধনের সঙ্গে গতি বেড়েছে লেনদেনে। শেষ ১৭ কার্যদিবসের (২৯ এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত) মধ্যে প্রতিটি কার্যদিবসে ডিএসইতে হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে। এতে ২০ মে পর্যন্ত ২০২১ সালে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৫৪ কোটি টাকা। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে ৯৮ দিন লেনদেন হয়েছে। এই ৯৮ দিনে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৫৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

এর আগে ২০২০ সালজুড়ে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয় এক লাখ ৩৪ হাজার ৯৮১ কোটি ২২ লাখ টাকা। এতে বছরটিতে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয় ৬৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তার আগে ২০১৯ সালে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয় ৪৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং মোট লেনদেন হয় এক লাখ ১৩ হাজার ৮২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

এছাড়া ২০১৮ সালে মোট লেনদেন হয় এক লাখ ৩৩ হাজার ৫৯১ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং প্রতি কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয় ৫৫২ কোটি তিন লাখ টাকা। ২০১৭ সালে মোট লেনদেন হয় দুই লাখ ১৬ হাজার ৯৫৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং প্রতি কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয় ৮৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর ২০১৬ সালজুড়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল এক লাখ ১৯ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। সে বছর প্রতি কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয় ৪৯৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এ তথ্য থেকেই স্পষ্ট হয়—গত কয়েক বছরের মধ্যে বর্তমান শেয়ারবাজার সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

অবশ্য লেনদেনের পরিমাণ আরও বেশি হওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এই বাজারে এক হাজার কোটি টাকা লেনদেন কিছুই না। দৈনিক গড় লেনদেন তিন থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের এখান থেকে কেউ যাতে কাউকে ঠকিয়ে, লুট করে, জালিয়াতি করে, চালাকি করে টাকা-পয়সা নিয়ে যেতে না পারে এজন্য আমাদের সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে। আমরা প্রত্যেক কমিশন মিটিংয়ে এ ধরনের কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমরা যতদিন আছি কেউ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করার সুযোগ পাবে না।

শেয়ারবাজারে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মো. রকিবুর রহমান বলেন, আমাদের পুঁজিবাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভর। তবে এখন বিনিয়োগকারীরা আগের চেয়ে পরিণত। তারা অনেক চালাক। এটা ভালো লক্ষণ। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সার্বিক তথ্য ভালো করে পর্যালোচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই গুজবের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করা উচিত হবে না। সেই সঙ্গে ঋণ করে, ধার করে বা জমি বিক্রি অথবা বন্ধক রেখে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত হবে না।

রকিবুর রহমান আরও বলেন, ব্যাংকে টাকা রাখলে ৫ শতাংশের মতো মুনাফা পাওয়া যায়। কিন্তু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে কেউ কেউ রাতারাতি বড় লোক হতে চায়। এত লোভ ভালো না। আপনি পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ৫-১০ হাজার টাকা মুনাফা পেলে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। কিন্তু পাঁচ লাখ টাকা ১০ লাখ হয়ে যাবে, এমন লোভ করা ঠিক না।

পুঁজিবাজারের বর্তমান চিত্র প্রসঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিএসইসি সম্প্রতি বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার পাশাপাশি বেশকিছু কোম্পানির আইপিও বাতিল করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন সাহসী ভূমিকা আগে দেখা যায়নি। এ কারণে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। যার সুফল এখন দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে শেয়ারবাজার যে পরিস্থিতিতে রয়েছে, ২০১০ সালের ধসের পর এত ভালো আবস্থা আর দেখা যায়নি। ২০১০ সালের পর বাজার কয়েকবার ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো সময় ছিল ২০১৪-১৫ সাল। কিন্তু সে সময় বাজারে বেশকিছু দুর্বল কোম্পানি আসে। যে কারণে বাজার ধরে রাখা যায়নি।

সুতরাং বর্তমানে শেয়ারবাজার যে ফুরফুরে অবস্থায় রয়েছে, এটা ধরে রাখতে বিএসইসির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ধরে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে বাজারে যাতে দুর্বল কোম্পানি আসতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং ভালো ভালো কোম্পানির আইপিও আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে বাজারের বর্তমান চিত্র দীর্ঘস্থায়ী হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ২০১০ সালের ধসের পর পুঁজিবাজার এতটা ভালো অবস্থানে কখনও আসেনি। বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যানের সাহসী নেতৃত্বের কারণে আজ আমার বিনিয়োগকারী ভাইয়েরা তাদের হারানো পুঁজি ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে বিএসইসি যে পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। কোনো চাপেই বিএসইসিকে এ পথ থেকে সরে আসা যাবে না।

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও লকডাউন ছিল। আর এই লকডাউন পিরিয়ডে দেশের পুঁজিবাজারে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। আর এমন পরিস্থিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং কমিশনাররা নিরবে বিদায় নেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে করোনাকালে বাজার পরিস্থিতিকে গতিশীল করতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে, পুঁজিবাজারকে আকর্ষণীয় করতে নানান ধরনের উদ্যোগ হাতে নেয়। একই সঙ্গে বাজারের অসৎ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেন। এর মাধ্যমে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করে। বাজারে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। যার ফলে বাজারের সূচক ও লেনদেন তলানি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে থাকে। পুঁজিবাজারে বাড়তে থাকে মূলধন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাজার আরও গতিশীল হবে।

বিজনেস নিউজ/এমআর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com