June 27, 2026, 4:36 am
শিশুদের টিআইএন সার্টিফিকেট না থাকার কারণে অতিরিক্ত করারোপ করছে ব্যাংক। এর ফলে বাচ্চাদের ব্যাংক হিসাবে টাকা রাখতে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। অতিরিক্ত করের চাপ কমাতে শিশুদের হিসাব থেকে প্রাপ্ত বয়স্কদের স্বাভাবিক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করে নিচ্ছেন তারা। হিসাব করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের বর্তমান আমানতের ওপর পাঁচ কোটি ৪৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা আয়কর নিয়েছে ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত আয়কর কর্তনের প্রভাবে কমে আসতে পারে স্কুল শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে টাকা জমানোর অভ্যাস। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর)। এতে করহার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘ছাত্রছাত্রীদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনয়নের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং তাদের আধুনিক ব্যাংকিং সেবা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তফসিলি ব্যাংকগুলো স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ সম্পর্কিত বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র/প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র/সর্বশেষ মাসের বেতন রশিদের সত্যায়িত অনুলিপি এর মাধ্যমে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে পারে। এক্ষেত্রে, ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে বাবা-মা অথবা আইনগত অভিভাবকের মাধ্যমে হিসাবটি পরিচালনা করতে হয়। সাধারণত বাবা-মা অথবা আইনগত অভিভাবক হতে প্রাপ্ত অর্থ/বৃত্তি/উপবৃত্তির অর্থ এ ধরনের হিসাবে জমা হয় এবং হিসাবের মূল সুবিধাভোগী ও হিসাবধারীর বাবা-মা অথবা আইনগত অভিভাবক। এছাড়া, অপ্রাপ্তবয়স্ক বিধায় হিসাবধারীর কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র ও ১২ অঙ্কের ই-টিআইএন থাকে না।’
‘আয়কর অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪-এর সেকশন ৫৩(এফ) অনুযায়ী ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের সুদ/মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ অথবা ১২ অঙ্কের ই-টিআইএন থাকা সাপেক্ষে ১০ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর (এআইটি) কর্তন করতে হয়। যেহেতু, স্কুল ব্যাংকিং হিসাবধারীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক
এবং তাদের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র ও ই-টিআইএন সার্টিফিকেট নেই, এ কারণে উক্ত বিধান অনুযায়ী তাদের হিসাব হতে ব্যাংকগুলো কর্তৃক ১৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর কর্তন করা হচ্ছে মর্মে ব্যাংক কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। তবে, স্কুল ব্যাংকিং হিসাবধারী ছাত্রছাত্রীদের বাবা/মা/আইনগত অভিভাবকরা তাদের ই-টিআইএন বিবেচনায় নিয়ে এরূপ হিসাবের বিপরীতে অর্জিত সুদ/মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ আয়কর কর্তনের জন্য ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করছে মর্মেও ব্যাংক হতে জানা গেছে।’ এক্ষেত্রে, হিসাবধারীর বাবা/মা অথবা আইনগত অভিভাবক, যাদের মাধ্যমে হিসাব পরিচালিত হয়, তাদের ১২ অঙ্কের ই-টিআইএনকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সুদের ওপর আয়করের পরিবর্তন আনার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
‘অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রছাত্রীদের ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আনার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সঞ্চয়ী মনোভাব তৈরিতে স্কুল ব্যাংকিং প্রকল্প যথাযথ ও ইতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলছে। আমানতের সুদ/মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ এর পরিবর্তে ১৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর কর্তন অব্যাহত থাকলে ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা উক্ত জমাকৃত অর্থ স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে জমা না করে নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে জমাকরণে উৎসাহিত হবেন। সেক্ষেত্রে অভিভাবকেরা যেহেতু ই-টিআইএন রয়েছে সেহেতু উৎসে আয়কর ১০ শতাংশ হারেই প্রদেয় হবে। ফলে, স্কুল ব্যাংকিং হিসাব কার্যক্রমটি বাধাগ্রস্ত হবে এবং ছাত্রছাত্রীদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ার উদ্দেশ্যও ব্যাহত হবে।’
‘বিষয়টা বিবেচনায় স্কুল ব্যাংকিং হিসাবগুলো ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা কর্তৃক পরিচালিত হয়ে থাকে, বিধায় যে সব অভিভাবকের ১২ অঙ্কের ই-টিআইএন রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং যে সব অভিভাবকের নিজের কোন ই-টিআইএন নেই তাদের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর ১৫ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে।’ এ বিষয়ে এনবিআরের মতামত প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে শিক্ষার্থীদের মোট একাউন্টের সংখ্যা ২৪ লাখ ৫০ হাজার ৫৬৪টি। স্কুল ব্যাংকিং হিসেবে শিক্ষার্থীদের জমা টাকার পরিমাণ এক হাজার ৮২১ কোটি ৪০ লাখ। আমানত ও হিসাবের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী স্কুল ব্যাংকিং আমানতের গড় সুদহার দুই শতাংশ। এতে বছরে ৩৬ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সুদ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এ সুদের ওপর ১৫ শতাংশ হারে আয়করের পরিমাণ দাঁড়ায় পাঁচ কোটি ৪৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা। শিক্ষার্থীদের টিআইএন না থাকায় প্রতি বছর এ পরিমাণ আয়কর গুনছে শিশু সঞ্চয়ীরা। হিসাব অনুযায়ী জুন প্রান্তিকের তুলনায় সেপ্টেম্বর শেষে একাউন্টের পরিমাণ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং আমানত বেড়েছে মাত্র তিন দশমিক ৩২ শতাংশ।
বিজনেস নিউজ/এমআরএম