October 24, 2026, 10:17 pm

ভ্যাট দেয়নি রবি, সুদ বেড়েছে ৪১ কোটি টাকা

ভ্যাট দেয়নি রবি, সুদ বেড়েছে ৪১ কোটি টাকা

একীভূত হওয়ার ভ্যাট পরিশোধ করেনি দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বেসরকারি মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড। ভ্যাটের টাকা পরিশোধে বিটিআরসিকে শর্তযুক্ত যে ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়েছে, তা দুই বছরেও নগদায়ন হয়নি। দুটি শর্ত দিয়েই রবি খালাস। অথচ দুটি শর্ত ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে। কিন্তু রবি একীভূত হওয়ার সেই ৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ভ্যাট এখনও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। যাতে ইতোমধ্যে সুদ দাঁড়িয়েছে ৪০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

ভ্যাট আদায়ে সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে সহযোগিতা চেয়ে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। ইতোমধ্যে দেয়া চিঠিতে রবির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে রবির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসিকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে রবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভ্যাট দিতে আমাদের কখনোই কোনো আপত্তি ছিল না, এখনও নেই। যে সেবার ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য আইনগতভাবে তার ওপর ভ্যাট দিতে আমরা বাধ্য। অনুরূপভাবে, ভ্যাট প্রদানকালে মূসক চালান (ভ্যাট রিসিপ্ট) পাওয়ার আইনগত অধিকারও আমাদের রয়েছে। আমাদের অনুরোধ, ভ্যাট প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে যেন যথাযথ মূসক চালান দেয়া হয়।

এনবিআর সূত্র জানায়, রবি আজিয়াটা লিমিটেড ও এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেডের একীভূতকরণের (মার্জার) ক্ষেত্রে ফি-এর বিপরীতে উৎসে ভ্যাট হিসাবে ৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা পরিশোধে ২৩ নভেম্বর বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন কর, কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী এনবিআরের সদস্যকে (মূসক নিরীক্ষা ও গোয়েন্দা) চিঠি দেয়। চিঠিতে এ রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। চিঠির কপি রবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিটিআরসি চেয়ারম্যান, এনবিআর সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি), এনবিআর চেয়ারম্যান, ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, মোবাইল অপারেটর রবি ও এয়ারটেল ২০১৭ সালে একীভূত (মার্জার) হয়। দেশের ইতিহাসে টেলিযোগাযোগ খাতে দুটি মোবাইল অপারেটর একীভূত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। রবি ও এয়ারটেল একীভূতকরণ ফি হিসেবে রবি বিটিআরসিতে ৪৭১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। যার ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে মূসক ৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ টাকার সমপরিমাণ ‘সিকিউরিটি’ হিসেবে বিটিআরসি রবির কাছ থেকে একটি শর্তযুক্ত ব্যাংক গ্যারান্টি নেয়। ২০১৭ সালে বিটিআরসি রবি থেকে ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডের ‘পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি (পিজিবি)’ গ্রহণ করে, যা এখনও বিটিআরসির কাছে রয়েছে।

আরও বলা হয়, মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী উৎসে কর্তৃত মূসক সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টি গ্রহণের কোনো আইনি বিধান নেই। বিটিআরসি এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে এনবিআরকে অবহিত করা এবং পরামর্শ ছাড়াই ব্যাংক গ্যারান্টি গ্রহণ করে। যার ফলে দুই বছরেও ব্যাংক গ্যারান্টি সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংক গ্যারান্টিতে দুটি শর্ত দিয়েছে রবি। এর মধ্যে প্রথম শর্তটি (মূসক-১১ চালান ব্যতীত বাংলালিংক ও গ্রামীণফোন কর্তৃক লাইসেন্স, স্পেকটার্ম ফি পরিশোধ) একীভূতকরণের ফি-এর বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। শর্তটি রবি ব্যাংক গ্যারান্টিতে অপ্রাসঙ্গিকভাবে স্থাপন করেছে। অথচ স্পেকটার্ম (টু-জি), স্পেকটার্ম (থ্রি-জি) ফি-এর বিপরীতে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক যখন যে হার ছিল সে হারে (টু-জি’র ওপর ১৫ শতাংশ ও থ্রি-জি’র ওপর ৫ শতাংশ) সম্পূর্ণ ভ্যাট পরিশোধ করেছে। গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক মূসক-১১ চালান ছাড়াই ভ্যাট পরিশোধ করায় রবির ব্যাংক গ্যারান্টিতে প্রথম শর্ত ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে। রবি নিজেও যখন যে হার প্রযোজ্য ছিল, সে হারে ভ্যাট পরিশোধ করেছে। ফলে ব্যাংক গ্যারান্টির একটি শর্ত পূরণ হওয়ায় ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নযোগ্য।

আরও বলা হয়, ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের জন্য ওয়ান ব্যাংককে চলতি বছরের ১১ অক্টোবর বিটিআরসি নির্দেশনা দিয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, রবি টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ এবং মূসক আইন অনুযায়ী একীভূতকরণ ফি’র বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধের আইনি বিধান পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণে ওয়ান ব্যাংক বিটিআরসির অনুকূলে ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নে আইনানুগভাবে বাধ্য। ওয়ান ব্যাংক নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হলে বিটিআরসি বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করবে। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওয়ান ব্যাংক গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক যে স্পেকটার্ম ও লাইসেন্স ফি-এর বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধ করেছে, তার দলিলাদি চেয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয়। বিটিআরসি ২০ সেপ্টেম্বর ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডকে সেই দলিলাদি সরবরাহ করে। এরপরও ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন করেনি ওয়ান ব্যাংক।

এলটিইউ’র চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংক গ্যারান্টির দ্বিতীয় শর্তটি একটি রিট মামলা নিয়ে, যা আদালতে বিচারাধীন। রবি রিট মামলা করে ২০১২ সালে, কিন্তু রবি-এয়ারটেল একীভূত হয় ২০১৭ সালে। রিট মামলাকে ব্যাংক গ্যারান্টিতে শর্ত দেয়া মানে সরকারি পাওনা পরিশোধকে রবির মতো কোম্পানির বিলম্বিত করার অপপ্রয়াস মাত্র। রিটে মূলত বিটিআরসিকে নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়টি ছিল। কিন্তু রিটের আর্জিতে একীভূত চার্জের ওপর ভ্যাটের বিষয়টি নেই। ফলে ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই।

অপরদিকে একীভূতকরণের ক্ষেত্রে এ ভ্যাট পরিশোধে এলটিইউ মূসক আইন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিটিআরসি বরাবর প্রাথমিক ও চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে। ভ্যাট পরিশোধ না করায় মূসক বিধিমালা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ জুলাই প্রথম ও ১২ আগস্ট দ্বিতীয় নোটিস জারি করা হয়। এরপরও ভ্যাট পরিশোধ হয়নি। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ১২ অক্টোবর এলটিইউতে একটি পর্যালোচনা সভা হয়। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসি উভয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি মত প্রদান করেন, যেহেতু ব্যাংক গ্যারান্টির দুটি শর্তের মধ্যে একটি শর্ত (গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক স্পেকটার্ম চার্জ, লাইসেন্স ফি মূসক চালান ব্যতীত বিটিআরসিকে পরিশোধ করেছে) ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে, সেহেতু ব্যাংক গ্যারান্টি অনতিবিলম্বে নগদায়ন করা যৌক্তিক।

সভায় ওয়ান ব্যাংকের প্রতিনিধিরা গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের দলিলাদি যাচাই করে দ্রুত ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান। কিন্তু এখনও তা নগদায়ন হয়নি। ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন না করলে প্রয়োজনে টেলিযোগাযোগ আইনের প্রবিধান অনুযায়ী রবির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ৪ নভেম্বর বিটিআরসিকে চিঠি দেয় এলটিইউ। ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নে সহযোগিতা চেয়ে ৯ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় এলটিইউ। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওয়ান ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন করেনি এবং রবি কর্তৃক এ বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করেনি। অনাদায়ী এ ভ্যাটের বিপরীতে মূসক আইন, ১৯৯১-এর ধারা (৩) অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ২ শতাংশ হারে এবং মূসক আইন, ২০১২-এর ধারা ১২৭ (১) অনুযায়ী ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ২ শতাংশ হারে সুদ ৪০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। রবি কর্তৃক বিটিআরসি বরাবর পরিশোধিত একীভূতকরণ ফি-এর বিপরীতে অনাদায়ী ভ্যাট ৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আদায়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে এনবিআরের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

এ বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, সব অপারেটরের জন্য একই আইন। গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক আইন মানতে পারলে রবি পারবে না কেন? এলটিইউ’র চিঠি পর্যালোচনা শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিজনেস নিউজ/এমআরএম

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com