April 19, 2026, 7:45 am

করোনায় আক্রান্ত ও মৃত পরিবারের ক্ষতিপূরণ পেতে আবেদনের পাহাড়

করোনায় আক্রান্ত ও মৃত পরিবারের ক্ষতিপূরণ পেতে আবেদনের পাহাড়

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসনসহ মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উৎসাহ দিতে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। এক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ বাবদ গ্রেডভেদে পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং মারা গেলে ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দেয়ার কথা বলা হয়।

এ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার লোভে দুর্নীতিগ্রস্ত রিজেন্ট হাসপাতাল ও জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তথা জেকেজি হেলথকেয়ারসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থের বিনিময়ে কোভিড-১৯ পজিটিভের সার্টিফিকেট সংগ্রহের হিড়িক পড়ে যায়।

পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও বেড়ে যায়। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে ক্ষতিপূরণ পেতে আবেদনের পাহাড় জমতে থাকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে। ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ করোনায় মারা যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয়া শুরু করেছে।

এদিকে প্রতিদিন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতর থেকে আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ পেতে শত শত আবেদন জমা পড়ছে। কিন্তু ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে ক্ষতিপূরণপ্রাপ্তির আশায় যারা আবেদন করছেন তাদের অর্থপ্রাপ্তির বিষয়ে বিকল্প চিন্তা করছে অর্থ বিভাগ। এক্ষেত্রে ইতোমধ্যে ভুয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেগুলো চিহ্নিত হয়েছে তাদের প্রদত্ত সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য হবে না। এছাড়া ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করতে যাচাই-বাছাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এমনকি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান বন্ধের বিষয়টিও চিন্তা-ভাবনা করে দেখা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটা যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করে দেয়াই ভালো।

করোনায় আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে উপরোক্ত বিষয়গুলো সামনে আশায় অর্থ বিভাগে এখন পর্যন্ত কত সংখ্যক আবেদন এসে জমেছে তা গুণে দেখা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

সূত্র বলছে, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো তিনজনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সরকার কয়েক ধাপে ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু সাধারণ ছুটির মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসনসহ মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সেবা দিয়ে যান।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের কাজে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। ক্ষতিপূরণের এই আর্থিক সহায়তা পেতে অনেকে রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথকেয়ারের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া সার্টিফিকেট নেন। পরে করোনা পরীক্ষা নিয়ে রিজেন্ট ও জেকেজির অনিয়মের বিষয়টি সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যারা লোভে পড়ে ভুয়া সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে অর্থসহায়তা পেতে আবেদন করছেন, তারাও কি ক্ষতিপূরণ পাবেন? অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, ‘না, এসব (রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথকেয়ার) দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া সার্টিফিকেট যারা নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, তারা কোনোভাবেই ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এমনকি একটা নির্দিষ্ট সময় পর ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানও বন্ধ করে দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ক্ষতিপূরণ প্রদান যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করে দেয়া উচিত। কারণ এ ক্ষতিপূরণের লোভে হাজার হাজার মানুষ ভুয়া করোনা পজিটিভ সনদ সংগ্রহ করছেন। এছাড়া সবার জীবনই মূল্যবান। তাহলে শুধু সরকারি চাকরিজীবীরাই এ সুবিধা পাবেন কেন?

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, যারা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, তাদের পরিবারকে বর্তমানে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া এখনও শুরু হয়নি। এখন আক্রান্তের হার এত বেশি হয়ে গেছে যে, রিজেন্ট ও জেকেজির মতো অসংখ্য ভুয়া সার্টিফিকেট দেয়া প্রতিষ্ঠান বের হবে, এটা আমরা আগে বুঝিনি। বিষয়টি নিয়ে এখন একটু চিন্তা করতে হচ্ছে। কোনটা অথেনটিক (সত্য) আর কোনটা নয়, এগুলো এখন দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ কাউকেই দেব না, তা কিন্তু নয়। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে। যে সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়েছে, আমরা আগে এটা ভাবিনি যে, এত সংখ্যক মানুষ ক্ষতিপূরণের আবেদন করবেন। এখন এটা আমাদের ভাবাচ্ছে যে, কোন ক্যাটাগরির সার্টিফিকেটে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে ক্ষতিপূরণ দেয়া বাবদ চলতি বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। যারা মারা গেছেন তাদের তো ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে। যারা আক্রান্ত হবেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু এখন যে সংখ্যক আবেদন আসছে তাতে ১০০ কোটি টাকায় হবে না। তাই বিকল্প কিছু একটা ভাবতে হচ্ছে সরকারকে।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলে ভিন্ন কথা। এক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা প্রদান যৌক্তিক বিষয়। কিন্তু শুধু আক্রান্ত হলেই পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ, এটার কোনো মানেই হয় না। এ ঘোষণা দেয়ার সময়ই আমি বলেছিলাম, যখন শত শত আক্রান্ত হবে তখন এটা দেয়া সম্ভব হবে না। তাই এটা যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করে দেয়া উচিত।

ক্ষতিপূরণ দেয়া প্রসঙ্গে গত ২৩ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে বলা হয়, করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানে সরাসরি কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ এ সংক্রান্ত সরকার ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মচারী দায়িত্ব পালনকালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ বাবদ সরাসরি আর্থিক সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

ওই পরিপত্রে আরও বলা হয়, ‘২০১৫ এর বেতন স্কেল অনুযায়ী, ১৫-২০তম গ্রেডের কেউ আক্রান্ত হলে তিনি ক্ষতিপূরণ পাবেন পাঁচ লাখ, মারা গেলে পাবেন ২৫ লাখ টাকা। ১০-১৪তম গ্রেডের কেউ আক্রান্ত হলে পাবেন সাড়ে সাত লাখ এবং মারা গেলে সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা। এছাড়া প্রথম-নবম গ্রেডের কেউ আক্রান্ত হলে পাবেন ১০ লাখ এবং মারা গেলে পাবেন ৫০ লাখ টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ যারা প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের সবার জন্য স্বাস্থ্যবীমার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বীমার ক্ষেত্রে সরকারকেই প্রিমিয়াম দিতে হবে। এছাড়া বীমার টাকা পেতে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় লেগে যায়। মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com