August 27, 2026, 5:14 pm
কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া সেই প্রশান্ত কুমার হালদার দেশে ফিরছেন। এমন খবরে পিকের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম হঠাৎ করেই বাড়ছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো হচ্ছে-ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড (আইএলএফএসএল),পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। এসব কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম দেড় টাকা থেকে আড়াই টাকা বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা আদালতের আশ্রয়ে দেশে ফিরছেন পিকে হালদার। ফলে কোম্পানিগুলোর দেনা-পাওনা মিটে যাবে। আবার সুস্থ্যদেহে ফিরবে কোম্পানিগুলো। তবে এই দাম বাড়াকে নৈতিবাচক ভাবেই দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত, পিকে হালদার কবে আসবে বা কিভাবে টাকা ফেরত দেবে সেটা অনেক দীর্ঘ সূত্রিতার বিষয়। এই টাকা ফেরত দেয়ায় কোন প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থানে যাবে কিনা সেটাও অনেক পরের কথা। কিন্তু এই টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে একটা মহল যেন বাজার থেকে ফায়দা লুটতে না পারে সে জন্য বিনিয়োগকারীদের সাবধান থাকতে হবে।
এদিকে পিকে হালদারের দেশে ফিরে টাকার ফেরত দেওয়ার খবরে তার লুট করা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর বেড়েছে। চলতি মাসের গত ৬ কার্যদিবসে তার সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ শেয়ারের দাম অস্বাবাবিক বেড়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তথ্য মতে, পিকে হালদারের সবচেয়ে বড় লুটের শিকার ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড (আইএলএফএসএল)। পিকে ফিরছেন এমন খবরে এই কোম্পানির শেয়ার দর গত ৬ কার্যদিবসে বেড়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা।পহেলা সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দর ছিল ৪ টাকা ৬০ পয়সা। আজ মঙ্গলবার শেয়ারটির দাম ছিলো ৬ টাকা ৮০ পয়সা। এর মধ্যে মঙ্গলবারই শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৬০ পয়সা।
এদিকে একই অবস্থা এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটির গত ৬ কার্যদিবসে শেয়ার দর বেড়েছে ২ টাকা ২০ পয়সা। গত ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ছিল ৫ টাকা ৯০ পয়সা। আজ মঙ্গলবার শেয়ারটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ১০ পয়সা।
এছাড়া বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) গত ৬ কার্যদিবসে শেয়ার দর বেড়েছে ১ টাকা ৪০ পয়সা। গত ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ছিল ৩ টাকা ৮০ পয়সা। আজ দিন শেষে শেয়ারটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ২০ পয়সা।
এদিকে পিকে হালদারের লুটের শিকার পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস দীর্ঘদিন ধরেই লেনদেন বন্ধ রয়েছে।
সূত্র জানায়, পিকে হালদার ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদের কাছে লিখিত আবেদন দেন। আবেদনে বলা হয়, তিনি দেশে ফিরতে চান এবং পৌঁছার পর আইএলএফএসএল অর্থ উদ্ধারে সহায়তা করতে চান। সে জন্য দুদক, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ও কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেন তাঁর দেশে আসায় কোনো বাধা তৈরি না করে। এরপর হাইকোর্টে আবেদনটি করা হয়। এতে যেকোনো শর্তে পিকে হালদারকে আদালতের জিম্মায় নিয়ে আইএলএফএসএল থেকে তাঁর ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া অর্থ ফেরতের জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ দেয়ার আরজি রয়েছে।
নানা কৌশল করে এসব প্রতিষ্ঠান দখল করেছেন মূলত একজন ব্যক্তি। প্রতিষ্ঠান দখল করার জন্য নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলেছেন, শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে টাকাও সরিয়েছেন। এমনকি দেশের বাইরেও কোম্পানি খুলেছেন। আর এই ব্যক্তি হলেন প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার।
প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের সময় পি কে হালদার প্রথমে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। আর এসব কাজে তাঁকে সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন—এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনেই সবকিছু ঘটেছে।
এখন পি কে হালদার পলাতক। আর আমানতকারীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন টাকা ফেরত পাওয়ার আশায়। প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পি কে হালদার ও তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসেবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, পি কে হালদারের হিসাবে ২৪০ কোটি টাকা এবং তাঁর মা লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা। তবে এসব হিসাবে এখন জমা আছে মাত্র ১০ কোটি টাকার কম। অন্যদিকে পি কে হালদার এক ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেই ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নিয়েছেন।
পিকে হালদারের জন্ম পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তাঁর মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পি কে হালদার ও প্রিতিশ কুমার হালদার—দুই ভাই–ই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
পিকে হালদারের নামে ব্যাংক এশিয়া, এনআরবি গ্লোবাল, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কয়েকটি ব্যাংকের হিসাবে বিভিন্ন সময়ে জমা হয় ২৪০ কোটি টাকা। হাল ট্রাভেল (হাল ট্রিপ) এজেন্সির চেয়ারম্যান পি কে হালদার নিজে। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা হাল ট্রিপের হিসাবে জমা হয় ৪০৭ কোটি টাকা। ফার্স্ট কমিউনিকেশনের পরিচালকও তিনি। এর ব্যাংক হিসাবে জমা হয় ৮২৩ কোটি টাকা।
সুখাদা লিমিটেডে পি কে হালদারের শেয়ার ৯০ শতাংশ ও মা লীলাবতী হালদারের ৫ শতাংশ। এ হিসেবে ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকা জমা হয়। লীলাবতী হালদারের ৩টি ব্যাংক হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা। রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে নেওয়া ৩ গ্রাহকের ঋণের ৬৩ কোট টাকাও লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয়। ওই সময়ে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি ছিলেন পি কে হালদার। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের হিসাবে এত টাকা জমা হওয়া নিয়ে কোনো ব্যাংক কখনোই প্রশ্ন তোলেনি।
ভাই প্রিতিশ কুমার হালদারের ব্যাংক হিসাবে ৫০ লাখ টাকা জমা থাকলেও তাঁর নামে রয়েছে হাল টেকনোলজি, হাল ট্রিপ টেকনোলজি, পিঅ্যান্ডএল হোল্ডিং, মাইক্রো টেকনোলজিস, নর্দান জুটসহ আরও নানা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ৫০০ কোটি টাকার বেশি জমা হয়, ঋণও রয়েছে।