May 25, 2026, 1:22 am

গরিবের চেয়ে ধনীরাই বেশি সামাজিক সুরক্ষার আওতায়

গরিবের চেয়ে ধনীরাই বেশি সামাজিক সুরক্ষার আওতায়

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, শুধু হতদরিদ্ররাই সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। কিন্তু সমাজের বহু সচ্ছল পরিবারও এই সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা নিচ্ছেন। পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদসহ বেশকিছু খাতে সামাজিক সুরক্ষার অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এখানে সমাজের বহু সচ্ছল পরিবারের বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত গরিব মানুষ সামাজিক সুরক্ষার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বেশ আগে থেকেই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনের টাকা বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দেখানো হয়। এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদের টাকাও এ খাতে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পেনশন বাবদ ২৩ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রের সুদ-ভর্তুকি বাবদ ছয় হাজার ৬২৫ কোটি টাকা রয়েছে। এটা সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মোট বরাদ্দের ৩৫ শতাংশ। এই দুটি খাতের বরাদ্দ বাদ দিলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় দাঁড়ায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এ ব্যয়েরও সিংহভাগ অর্থ প্রকৃতপক্ষে যাদের পাওয়ার কথা, তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ মানুষ বিত্তশালী। কিন্তু এদের বড় একটি অংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সুবিধা গ্রহণ করছেন। ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিতরণ করা সুবিধার ৭৫ শতাংশই পেয়েছেন সচ্ছলরা। তার মানে, যারা পাওয়ার যোগ্য তাদের বেশিরভাগই পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত দরিদ্র অনেকেই এই কর্মসূচির মধ্যে ঢুকতে পারছেন না। ফলে এ খাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক নিরাপত্তার নীতিমালা পর্যালোচনা করে তা সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্যাংক আমানতের চেয়ে সঞ্চয়পত্র কিনলে বেশি সুদ পাওয়া যায়। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্নিষ্টরা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এই অর্থব্যয়কে শুভংকরের ফাঁকি হিসেবে দেখছেন। তারা বলেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ বেশি দেখানোর জন্য এটা করা হয়। যে কারণে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ আপাতত অনেক বেশি মনে হয়, প্রকৃতভাবে তা নয়।সাবেক অর্থসচিব বর্তমানে কম্পট্রোলার অডিটর জেনারেল (সিএজি) মুহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, পেনশনের বিষয়টি সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা উচিত কি অনুচিত, তা নিয়ে আলোচনার দাবি রাখে। তবে সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন করার ফলে এখানে অনিয়ম বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উপকারভোগীরা এর সুফল পাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, পেনশনের টাকা সামাজিক সুরক্ষা খাতে আসার কথা নয়। এটা দরিদ্রদের সুরক্ষা দেয় না। এটা আলাদা খাতে দেখানো উচিত। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে গরিবদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে এখানে তাদের সুরক্ষা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। ড. শামসুল আলম আরও বলেন, কে গরিব, কে ধনী তা শনাক্তের জন্য ন্যাশনাল হাউস হোল্ড ডাটা ব্যাংক গঠনের কথা ছিল; কিন্তু নানা কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সিনিয়র সচিব, সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা অবসরের পর পেনশন পান। আবার নিম্ন স্তরের পিয়নও পেনশন পান। এগুলোর সব সামাজিক সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী যেভাবেই হোক ২০ বিঘা জমির মালিক হন। তিনি প্রশ্ন করেন, ওই ব্যক্তিকে কেন সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে? সামাজিক সুরক্ষা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। এটা পর্যালোচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সঞ্চয়পত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার এর মাধ্যমে ঋণ নেয়। বিনিময়ে সুদ দেয়। যদিও বাজার অপেক্ষা সুদ এখানে একটু বেশি। সরকার এখানে কিছুটা সুবিধা দেয়। তারপরও আমি বলব, এটা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। কারণ, কোটিপতিরাও এখানে বিনিয়োগ করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত চার অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআইএর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, পেনশনের টাকা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দেখানো উচিত নয়। কারণ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীরা তো হতদরিদ্র নন। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা তাদেরই দিতে হবে, যারা হতদরিদ্র। কোনো আয়-রোজগার নেই। সোশ্যাল সেফটিনেটের জন্য যে নীতিমালা আছে, তা পর্যালোচনার পরামর্শ দেন তিনি।

সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদও মনে করেন, পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদ- এসব সামাজিক সুরক্ষা খাতে দেখানো ঠিক না।

জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ১৩২টি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু নগদ অর্থও দেওয়া হচ্ছে। তবে বেশিরভাগই কর্মসূচিভিত্তিক। বয়স্ক, বিধবাসহ সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন আটটি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অধীন রয়েছে মাতৃত্বকালীনসহ আরও কয়েকটি ভাতা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানী ভাতা। ভিজিএফ, ভিজিডি, টিআর, কাবিখাসহ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত হচ্ছে এগারোটি কর্মসূচি। এর বাইরে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com