August 27, 2026, 1:31 pm
দেশের ব্যাংকিং খাতে যখন খেলাপি ঋণের বোঝা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, তখন সেই চাপ থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারছে না তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোও। এবার সেই তালিকায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে সিটি ব্যাংকের নাম। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪২২ কোটি টাকা।
শুধু দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ছে—এমন ধারণার বিপরীতে সিটি ব্যাংকের এই চিত্র নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ মূলধন ও আর্থিক সূচকের দিক থেকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে সিটি ব্যাংককে বিবেচনা করা হয়। অথচ মাত্র এক প্রান্তিকেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণে কয়েকশ কোটি টাকা যোগ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এই সময়ে ৪৪ ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ ব্যাংকটির মতো তুলনামূলক শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানের ব্যাংকেও যখন খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ছে, তখন ব্যাংকগুলোর ঋণ মূল্যায়ন, ঋণ আদায় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিন মাসে ৪২২ কোটি টাকা বৃদ্ধি
জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪২২ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৯২ কোটি, উত্তরা ব্যাংকের ৪০৬ কোটি এবং ব্যাংক এশিয়ার ৬৬২ কোটি টাকা। বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণও বেড়েছে ২১৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, শুধু দুর্বল ব্যাংক নয়—বেসরকারি খাতের অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংকগুলোর ঋণখেলাপিও এখন বাড়ছে। এটি ব্যাংকিং খাতের ঋণমানের অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
গোপন খেলাপি ঋণও কি সামনে আসছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির একটি কারণ হলো আগের প্রান্তিকে কিছু ব্যাংক প্রকৃত খেলাপি ঋণ কম দেখিয়েছিল। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব গোপন খেলাপি ঋণের একটি অংশ শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে।
তবে সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৪২২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে ঠিক কোন ঋণ, কোন খাত বা কোন বড় ঋণগ্রহীতা দায়ী—সেটি স্পষ্ট হওয়া জরুরি। শুধু সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটকে দায়ী করলেই ব্যাংকটির ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ভালো ব্যাংকের জন্যও সতর্কবার্তা
সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি সরাসরি কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। কিন্তু একটি তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি কয়েকশ কোটি টাকা বেড়ে যাওয়া অবশ্যই সতর্ক হওয়ার মতো বিষয়।
ব্যাংকারদের মতে, মূল্যায়ন ও জামানত ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, ব্যবসায়িক মন্দা এবং ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে অতীতে ঋণ অনুমোদনে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপও ব্যাংকিং খাতে অনিচ্ছাকৃত ও ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংস্কৃতি তৈরি করেছে।
এসআর
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.