May 31, 2026, 7:41 am

রপ্তানিতে পোশাক খাতের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে আবারো শঙ্কা

রপ্তানিতে পোশাক খাতের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে আবারো শঙ্কা

বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী মহামারীর ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়া দেশের পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, বছরের শেষে বড়দিন ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও গতি আসবে বলে উদ্যোক্তারা আশা করছিলেন, কিন্তু সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ রপ্তানিকারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে।

গত অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির খবর এসেছিল পোশাক খাত থেকে; অক্টোবর মাসে এসে সেই ধারায় ছেদ পড়েছে। কারখানা মালিকরা বলছেন, পণ্যমূল্য কমে যাচ্ছে, উৎপাদন খরচ যাচ্ছে বেড়ে। রপ্তানির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের জন্য নতুন কার্যাদেশ এসেছে আগের বছরের তুলনায় কম।

ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক খাতে পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন পোশাক ব্যবসায়ীরা।

পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা উদ্বিগ্ন। বেশ সতর্কতার সাথে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের মত।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের ঋণ সহায়তা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাহস করে কারখানা চালু করাসহ আরও কিছু কৌশল নিয়ে বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। এখন যেহেতু নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে, আগের পদক্ষেপগুলো মূল্যায়ন করে নতুন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া উচিত।

গত বছরের শেষে চীন থেকে নতুন করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। সেই ধাক্কা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে স্পষ্ট হয় মূলত মার্চ মাসের শুরুতে।

২০১৯ সালের মার্চে যেখানে ২৮২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল, চলতি বছরের মার্চে তা ২২৫ কোটি ৬২ লাখ ডলারে নেমে আসে।

মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে পুরো এপ্রিল মাস জুড়ে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো ছিল কার্যত বন্ধ। এমনকি পণ্য জাহাজিকরণও অনেকটা থমকে ছিল।

এই পরিস্থিতিতে এপ্রিল মাসে মাত্র ৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব হয়; যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ কম।

তবে ইউরোপের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি এবং দেশের পোশাক কারখানাগুলো খুলতে শুরু করার পর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এ খাত।

মে মাসে ১২৩ কোটি এবং জুন মাসে ২২৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির মধ্য দিয়ে ধাক্কা অনেকেটা সামলে ওঠা সম্ভব হয়।

জুনে পোশাক রপ্তানিতে ৬ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও পরের তিন মাসের (জুলাই, অগাস্ট, সেপ্টেম্বর) পরিস্থিতি কারখানা মালিকদের মনে সাহস ফিরিয়ে আনে।

কিন্তু অক্টোবরের ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি আবার নতুন করে শঙ্কা জাগাচ্ছে।

সরকারি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও পোশাক রপ্তানিকারক সমিতির তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে উভেন পোশাক রপ্তানি খুব ভালো করতে না পারলেও নিট পোশাকের রপ্তানি ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক।

সব মিলিয়ে জুলাই মাসে পোশাক রপ্তানিতে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়, এরপর অগাস্ট মাসে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। কিন্তু অক্টোবর মাসে এসে আগের বছরের ওই মাসের চেয়ে রপ্তানি কমে গেছে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর আগেই দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপের দেশগুলোতে লকডাউন শুরু হয়েছিল। ফলে মার্চের শুরু থেকেই একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করতে শুরু করেন পশ্চিমা ক্রেতারা। এই পরিস্থিতিতে পোশাক খাতে অস্থিতরা দেখা দেয়। একদিকে চলতে থাকে ছাঁটাই, অন্যদিকে বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামেন কর্মীরা।

লকডাউনের কারণে কিছুদিনের জন্য কারখানাগুলো বন্ধ থাকলেও লোকসান কমাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবার কাজ শুরু করেন মালিকরা। বিদেশি ক্রেতাদের স্থগিত করা অনেক কাজও আবার ফিরতে শুরু করে। বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে গত সেপ্টেম্বরে ঢাকা ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের অবস্থান কর্মসূচি

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক মাঠ জরিপে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে পোশাক খাতের পুরুষ কর্মীরা গড়ে মাত্র ৪৩ ঘণ্টা এবং নারী কর্মীরা ৪২ ঘণ্টা কাজ করেন। মে মাস থেকে কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং অগাস্ট সেপ্টেম্বরে তা আবার ২০১৯ সালের মত মাসে ২৪৬ ঘণ্টায় ফিরে আসে।

কর্মীদের বেতন পরিশোধের জন্য সরকারের দেওয়া স্বল্প সুদের ঋণও পোশাক কারখানা মালিকদের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রসদ যোগায়।

শ্রমিকদের এপ্রিল, মে ও জুন মাসের বেতন পরিশোধ করতে ৪ শতাংশ সুদে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয় পোশাক খাতে। মালিকদের আবেদনে পরে জুলাই মাসে দেওয়া হয় আরও প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, মহামারীর সঙ্কট মকাবেলায় সরকার যে প্রণোদনামূলক ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকটাই নিয়েছেন পোশাক কারখানার মালিকরা।সঙ্কটে ওই ঋণ বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এখন এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হয়েছে তা নিশ্চিত হতে একটি বিশদ পর্যালোচনা প্রয়োজন। কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে এই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালের প্রথম ১০ মাসে যেখানে ২৭ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে হয়েছে ২২ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের।

বছর শেষে এই ব্যবধান আরও কমে আসবে বলেই আশা করছিলেন বাজার বিশ্লেষকরা। আর ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন, ডিসেম্বরে বড়দিনের পরব ঘিরে ক্রেতা দেশগুলোতে বিক্রি আরও বাড়বে।

কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আবার বেড়ে যাচ্ছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে নতুন করে লকাডাউনের মত বিধিনিষেধ শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকরাও নতুন করে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন।

িষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, রপ্তানির আকার বিবেচনা করলে এই খাত গত ২/৩ মাস ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই সময়ে পণ্যমূল্য নিয়ে আমাদেরকে বেশ ছাড় দিয়ে এই পরিস্থিতি ধরে রাখতে হয়েছে। বর্তমানে পণ্যমূল্যে কমে যাওয়াটাই রপ্তানিকারকদের বেশি বিপদে ফেলছে।

তিনি তথ্য দেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পোশাকের রপ্তানিমূল্য গত বছরের একেই সময়ের তুলনায় কমেছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর কেবল সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানিমূল্য কমেছে আগের বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ।

তিনি বলেন, এখন আবার পশ্চিমা দেশগুলোতে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। ফলে রপ্তানির ভলিউম আবার কমে যেতে পারে। ক্রেতারা তাদের অর্ডার স্থগিত করে দিতে পারেন। এসব ঘটনা ঘটলে কারখানাগুলোতে আবারও কর্মহীনতা সৃষ্টি হবে।

বিজনেস নিউজ/এমআর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com