October 13, 2026, 12:22 pm
বাংলাদেশে টাকা পাচার রোধে কাজ করে বেশ কয়েকটি সংস্থা। তবুও দেশ থেকে প্রতিবছর ৮ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পাচার রোধ করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে সঙ্কট থাকবে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। পাচার রোধ করতে সরকারের সদিচ্ছা বড় প্রয়োজন বলেও মন্তব্য অর্থনীতিবিদদের। তাদের মতে, সরকার চাইলেই পারে পাচার রোধ করতে এবং পাচার করা টাকা ফেরত আনতে।
সম্প্রতি অর্থপাচার রোধে কাজ করা আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়ে সংস্থাটি বলে, টাকা পাচার রোধে কাজ করছে বিএফআইইউ। দেশ থেকে যে টাকা পাচার হচ্ছে, কারা পাচার করছে সেসব সম্পর্কে খোঁজ চলছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু তথ্য পেয়েছে তারা। গেল বছর ১০৩টি তথ্য চাওয়া হয় বিভিন্ন দেশের কাছে। তারমধ্যে ৯৯টি তথ্য তারা পেয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশ থেকে টাকা পাচার রোধ ও ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই পাচার রোধ এবং ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাদের মতে, শতভাগ সম্ভব না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হবে সরকার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘টাকা পাচার রোধ করা এবং ফিরিয়ে আনা দুটি ভিন্ন ব্যাপার। প্রথমত টাকা পাচার রোধ করা। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে টাকা পাচার ঠেকাতে বেশ কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তারা বেশ ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। কিন্তু তাদের ক্যারিয়ার খুব সুখকর ছিলো না। তাদেরকে নানান ভাবে হেনস্থা করা হয়েছে। এসব দিক দেখে অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। টাকা পাচার রোধ করতে দেশের বিদ্যমান আইন দিয়েই তা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো সিদ্ধান্তটা নেবে কে? এক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেসব সেক্টরে টাকা পাচার হয় সেসব জায়গায় নজরদারি বাড়াতে হবে।’
টাকা ফেরতে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘টাকা ফেরত আনা কঠিন তবে অসম্ভব নয়। কারণ এ সরকারের সময়েই সিঙ্গাপুর থেকে টাকা ফেরত আনা হয়েছে। এভাবে উদ্যোগ নিলে টাকা ফেরত আনা এবং সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনা গেলে পাচার রোধও সম্ভব।’
টাকা পাচার রোধ করতে প্রথম প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা বলে মন্তব্য করেন ড. আহসান এইচ মনসুর। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘পাচার রোধ করতে চাইলে সরকারের পলিসি চেঞ্জ করতে হবে। পুরোপুরি পাচার রোধ করা সম্ভব হবে না, পৃথিবীর কোনো দেশ পারেওনি। তবে আমাদের মতো দেশ থেকে টাকা পাচার যদি ৫০ ভাগও কমানো যায় তাও তো অনেক। এখন প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে বলে জানা যায়। এসব পাচার রোধে এনবিআর এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘টাকা পাচার করছে কারা? বেশিরভাগই সরকারি দলের বড় নেতা বা সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তারা। গেল বছরগুলোতে সরকারি কর্মকর্তারা যে পরিমাণ টাকা পাচারের সাথে জড়িত তার পরিমাণ অনেক বেশি। রাজনৈতিক নেতারাও এত টাকা পাচার করতে পারেননি। এসব সরকারি কর্মকর্তাদের বিষয়ে সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে।’
বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের জন্য ৩টি ক্ষেত্রকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে বলা হয়। এরমধ্যে প্রধান পথটি হলো বৈদেশিক বাণিজ্য। এছাড়া ব্যাংক ও পুঁজিবাজার থেকে টাকা পাচার করা হয় বলে জানা যায়। ব্যাংক ঋণ নিয়ে আমদানির নামে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে লেটার অফ ক্রেডিট বা এলসি ওপেন করা হয়। যে পরিমাণ পণ্য আনার কথা সে পরিমাণ পণ্য না এনে সে টাকা পাচার করা হয় বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।
টাকা পাচার রোধ করতে সরকারি সংস্থাগুলোকে আরও ইতিবাচকভাবে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘টাকা পাচারের মূল কারণ হলো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং সঠিক বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকা। এসব কারণেই মূলত টাকা পাচার হয়ে থাকে। সামনে নির্বাচনী বছর। এ সময় অনেকেই পট পরিবর্তনের চিন্তায় টাকা পাচার করতে চাইবে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।’
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘টাকা ফেরত আনা সহজ। কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যে দেশে টাকা পাচার করা হয় তার সুস্পষ্ট তথ্য থাকলে তারা টাকা দিতে বাধ্য। এমন উদাহরণ আমাদের দেশেই রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস) স্বাক্ষর না করায় এ চুক্তির আওতায় নেই।’
যমুনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নূরুল আমিন বলেন, ‘সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই যে শতভাগ পাচার রোধ সম্ভব তা বলা যায় না। কারণ এখানে কিছু মানসিক ব্যাপারও আছে। অনেকেই উন্নত দেশে বসবাসের চিন্তায় টাকা পাচার করে থাকেন। এখন সরকার তো চাইলে কারো মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারে না। কিন্তু সরকার চেষ্টা করলে যতটা কমাতে পারবে সেটাও কম না। এক্ষেত্রে সরকারের সবগুলো সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অটোমেটিক ইনফরমেশন এক্সচেঞ্জ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার কারণে সুইজারল্যান্ড থেকে তথ্য এবং টাকা কোনোটাই ফেরত আসে না।’
বিএফআইইউ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেল অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২১-২২ সালে ৮ হাজার ৫৭১টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি, যেখানে আগের বছরে এর সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের কিছু বেশি। এ বছর ৬২ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে সন্দেহজনক লেনদেন