October 14, 2026, 1:08 am

রেকর্ড ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল বিদেশি ঋণ

রেকর্ড ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল বিদেশি ঋণ

এক হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়েছে বিদেশি ঋণ। করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় ওলটপালট হয়ে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতিতে কম সুদের বিদেশি ঋণ প্রাপ্তিতে এই রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-ইআরডি জানিয়েছে, ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ১ হাজার কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার ডলারের ঋণসহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ।

বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা) টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। এই অঙ্ক আগের অর্থবছরের (২০২০-২১) চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো অর্থবছরের এত বেশি বিদেশি ঋণ আসেনি।

তবে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে চলা আমেরিকান মুদ্রা ডলারের অস্থির বাজারে টাকার অব্যাহত দরপতনে এই বিদেশি ঋণ নিয়ে চিন্তিত অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর।

তিনি বলছেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা মহামারির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ঋণসহায়তা পাওয়ায় এই উল্লম্ফন হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই ঋণ পাওয়া গেলে খুবই ভালো হতো। কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এই ঋণ তো আমরা প্রতি ডলার ৮৪/৮৫ টাকা হিসাবে পেয়েছি। এখন ডলারের দর ১১০ টাকায় উঠেছে। আরও কত বাড়বে, কে জানে। আমাদের ঋণের বোঝা কিন্তু অনেক বেড়ে গেল।

ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৭৯৫ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার (৭.৯৬ বিলিয়ন) ডলার ঋণসহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ। তার আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসেছিল ৭৩৮ কোটি (৭.৩৮ বিলিয়ন) ডলার।

বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ বাড়তে থাকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে। ওই বছরই এক লাফে অর্থছাড় ৩০০ কোটি থেকে ৬৩৭ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। তারপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আসে ৬৫৪ কোটি ডলার।

শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ নিয়েও নানা কথা হচ্ছে। যদিও দুই দেশের তুলনা নাকচ করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বৈদেশিক ঋণ এখনও ১৩ শতাংশের নিচে; আর শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে তা ৫০ শতাংশের কাছাকাছি।

ইআরডি বৃহস্পতিবার বিদেশি ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি ও ছাড়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাংলাদেশকে ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার (৮.২০ বিলিয়ন) ডলার ছাড় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দাতারা। পাওয়া গেছে ১ হাজার কোটি ৮৩ লাখ ডলার।

এ হিসাবে গত অর্থবছরে দাতারা বাংলাদেশকে যে ঋণ দিতে চেয়েছিল তার থেকেও ২২ শতাংশ বেশি ছাড় করেছে। বিদেশি ঋণসহায়তা প্রাপ্তিতে এমনটা বিরল।

ছাড় করা ঋণের মধ্যে ১ হাজার কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার পাওয়া গেছে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে। ১৯ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার পাওয়া গেছে অনুদান। এর মধ্যে ২৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার খাদ্য অনুদান এবং ১৯ কোটি ৫০ লাখ ৯০ হাজার ডলার প্রকল্প অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে।

২০২০-২১ অর্থবছরের ৭৯৫ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার ছাড় করেছিল দাতারা। সে হিসাবেই গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণসহায়তা বেড়েছে ২৬ শতাংশ।

ইআরডির তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে দাতাদের ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি কিছুটা কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের ৯৪৪ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার ডলারের ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দাতারা। গত অর্থবছরে সেই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ কমিয়ে ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ কমিয়ে ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার ডলারে নামিয়ে আনেন দাতারা।

২০২১-২২ অর্থবছরে আগে নেয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ সময়ে সরকার আসল ও সুদ বাবদ উন্নয়ন সহযোগীদের ২০১ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার শোধ করেছে। গত অর্থবছরে সুদ-আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১১৯ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ডলার।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিদেশি ঋণ বাড়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতির গবেষক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘কম সুদের বিদেশি ঋণসহায়তা বাংলাদেশের উন্নয়নে বরাবরই অবদান রেখে চলেছে। দুই-আড়াই বছরের মহামারির পর এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকেই পাল্টে দিয়েছে। এরপরও এখন পর্যন্ত আমরা মোটমুটি ভালো অবস্থায় আছি। এই ঋণ আমাদের অর্থনীতির গতি ইতিবাচক ধারায় রাখতে অবদান রাখছে। তবে আমেরিকান মুদ্রা ডলারের বিপরীতে টাকার অব্যাহত দরপতন আমাদের বিপদে ফেলে দিয়েছে; উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকে ডলারের দাম ১১০ টাকায় উঠে গেছে। এই যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ আমরা নিয়েছি, সেটা কিন্তু ৮৪, ৮৫ কিংবা ৮৬ টাকায় নিয়েছিল। ডলারের দাম যদি এভাবে বেড়েই চলে, তাহলে কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা জানি না। সে ক্ষেত্রে এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে কত টাকা দরে ডলার কিনে শোধ করতে হবে, সেটাই এখন উদ্বেগের বিষয়। তাই যে করেই হোক, যেভাবেই হোক ডলারের বাজারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তা নাহলে কিন্তু আমাদের সামনে বড় বিপদ আছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com