August 24, 2026, 11:59 am

সেই স্টাইল ক্র্যাফটকে ঋণ দিতে মরিয়া অগ্রণী ব্যাংক

সেই স্টাইল ক্র্যাফটকে ঋণ দিতে মরিয়া অগ্রণী ব্যাংক

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলেনের আলোচনা উঠলেই চলে আসে স্টাইল ক্র্যাফটের নাম। দীর্ঘদিন থেকে বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন করছেন কোম্পানির হাজারো শ্রমিক। এই প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিলে আদায় হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান খোদ অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক পরিচালক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরোপ করা হয়েছে একাধিক শর্ত। তার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ দিতে চলেছে অগ্রণী ব্যাংক।

৭৪৮তম বোর্ড সভার স্টাইল ক্র্যাফট নিয়ে দ্বিতীয় আলোচনায় ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। জামানতকৃত সম্পত্তির মূল কাগজপত্র জমা দিতে অতিরিক্ত দুই মাস সময় দেয়া হয়েছে। কিন্তু সম্পত্তির মূল কাগজ হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ঋণ বিতরণের শর্ত দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চাচ্ছে ব্যাংক।

এর আগে অগ্রণী ব্যাংকের ৭৪৭তম বোর্ড সভায় স্টাইল ক্র্যাফট লিমিটেডের অনুকূলে মোট ৩৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করে অগ্রণী ব্যাংক। এতে আপত্তি জানান তিন পরিচালক। এর ভিত্তিতে কোম্পানির বিস্তারিত জানতে চেয়ে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সবকিছু পর্যালোচনা করে ঋণ বিতরণের আগে পাঁচটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়।

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে অগ্রণী ব্যাংকের বেশকিছু অনিয়ম। বিভিন্ন চাপে প্রশ্নবিদ্ধ পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান স্টাইলক্র্যাফটকে ঋণ দিতে অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে বিতরণের জন্য জুড়ে দেয়া হয় বেশ কয়েকটি শর্ত। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑসম্পত্তির মূল দলিল গ্রহণ, রাজউকের অনাপত্তি, পূবালী ব্যাংকের অনাপত্তি, এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরবর্তী বোর্ড সভায় আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্তগুলো উপস্থাপন করা। পরবর্তী বোর্ড সভায় ওই তিন পরিচালক ছাড়াই স্টাইল ক্র্যাফটকে ঋণ দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অগ্রণী।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বিজনেস নিউজকে বলেন, ‘আমরা সম্পত্তির মূল কাগজপত্র পেয়ে গেছি। তবে এসব সম্পত্তির মালিক ছিলেন বর্তমান মালিকের মা। মালিকানার নাম পরিবর্তনের জন্য পর্ষদের অনুমতিক্রমে দুই মাস সময় দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শর্ত পূর্ণ করে ঋণ বিতরণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

দুই মাস সময় দেয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমাদের সব বোর্ড মেমোই তো বাংলাদেশ ব্যাংকে যায়। এই মেমোটা গেলে দুই মাসের বিষয়টা বাংলাদেশ ব্যাংকও জানতে পারবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অগ্রণী ব্যাংকের এক পরিচালক বলেন, ‘সর্বশেষ বোর্ড সভায় স্টাইল ক্র্যাফটকে ঋণ দেয়ার বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে আমরা অংশগ্রহণ করিনি। আমরা ঋণটা ভালো মনে করিনি বলেই নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলাম। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু শর্ত দিয়েছিল। সেগুলো পরিপালন করে তারা যদি ঋণ আদায় করতে পারে, তাহলে তারা বিতরণ করুক। এখানে তো আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা ঋণ দিয়ে আদায় না করতে পারলে তখন তারা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এখানে আমাদের করণীয় কিছু নেই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছয় মাসের বকেয়া মজুরির দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করে আসছেন স্টাইল ক্র্যাফটের শ্রমিকরা। এরই ধারাবাহিকাতায় গত ৪ নভেম্বর বিজয়নগরের শ্রমভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদান কার্যক্রম পালন করেছে তারা। শ্রমিকরা জানান, এর আগে মালিকপক্ষ গাজীপুরে লিখিত ও মৌখিক চুক্তি সাতবার ভঙ্গ করার পর দুই দফায় তিন দিন তারা বিজিএইএ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করেন। মজুরি পরিশোধ করার দাবিতে গত ২৬ অক্টোবর থেকে তারা শ্রমভবনে লাগাতার অবস্থান করছেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে তারা জানান।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টাইলক্র্যাফট বেসরকারি পূবালী ব্যাংকে সম্পত্তির প্রকৃত নথি/দলিল রাখা সত্ত্বেও অগ্রণী ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ঋণ অনুমোদন করেছে। কিন্তু রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) থেকে অনাপত্তি নেয়া ছিল পূর্বশর্ত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাবিত সম্পত্তির প্রকৃত নথি, বায়া দলিল, সিএস, এসএ, আরএস, মিউটেশন পর্চা, ডিসিআর, সর্বশেষ ভূমি করের রশিদ ও নির্দায় সনদপত্র ছাড়া এই কোম্পানির অনুকূলে ঋণ দেয়া যাবে না। তার পরও ঋণটি অনুমোদন করা হয়েছে, যা গুরুতর আনিয়ম। অনিয়মের মাধ্যমে সম্পত্তি বন্ধক কার্যক্রমে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে অগ্রণী ব্যাংককে গত ১৩ অক্টোবর চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই পদক্ষেপের আগে তিন পরিচালকের আপত্তি সত্ত্বেও অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তার ৭৪৭তম সভায় পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ২৫ কোটি টাকার সিসি এবং ১০ কোটি টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সীমা অনুমোদন করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ পরিশোধের জন্য চলতি বছরের ১৮ মে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে চলতি মূলধন ঋণের জন্য আবেদন করে এবং প্রকৃত চাহিদার যথাযথ মূল্যায়ন না করেই ঋণ অনুমোদন করা হয়। এছাড়া বন্ধকী দলিল সম্পাদন করা হয়েছে গুলশান সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। বন্ধকদাতা ডা. আলমাস বেগমের স্বাক্ষরের পরিবর্তে টিপসই প্রদান করা হয়। এতে সার্বিক প্রক্রিয়াটি সন্দেহজনক বলে প্রতীয়মান হয়। আবার মূল দলিল না থাকার কারণে আইনগত প্রক্রিয়ায় ঋণ আদায় করতে হলে সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ আদায় সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বেসরকারি পূবালী ব্যাংক স্টাইলক্র্যাফটকে ২০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো সম্পত্তি বন্ধক রাখতে না পারায় ব্যাংকটি পাঁচ কোটি টাকা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও মুনাফা কমে যাওয়ায় কোম্পানিটিকে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ব্যাংক আর বাড়ায়নি। এরপর প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ব্যাংকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোনের জন্য আবেদন করে, যা অনুমোদনও করেছে ব্যাংকটি।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com