October 13, 2026, 6:40 am
লাগামহীন ঋণ জালিয়াতি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ শাসন ও করোনার প্রভাবে নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কমেছে আয়, বেড়েছে ব্যয়। খেলাপি ঋণ ও লিজ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ও প্রভিশন খাতে অর্থ আটকে থাকার অঙ্কও বেড়েছে। কমেছে নিট সম্পদ, মূলধন থেকে আয় ও মুনাফা। সার্বিকভাবে বেড়েছে মূলধন ঘাটতি। নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি একটি প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছরে সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা নামে বেনামে ঋণ নিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরিচালকদের লুটপাটের কারণে সাতটি প্রতিষ্ঠানই এখন পথে বসার উপক্রম। পরিশোধ করতে পারছে না আমানতকারীদের অর্থ। এসব ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এদিকে আদালতের নির্দেশে তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের একজন সদস্য বলেন, ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫-৭টি অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাকিগুলো বেশ ভালো আছে। কিন্তু দুর্বলগুলোর কারণে পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে গড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসা কমেছে। বিতরণ করা ঋণ ও লিজ খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়ায় তারল্য সংকট বেড়েছে।
এই ধাক্কা সামলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার করেছে। অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে নীতি কাঠামোতে দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ছাড়, যাতে দুর্বলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আবার উঠে দাঁড়াতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবল করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেসব অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে।
তহবিল সংকট : আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট তহবিলের ৮৪ শতাংশই আসে ব্যাংক থেকে। বাকি ১৬ শতাংশ সঞ্চয়ীদের আমানত ও অন্যান্য উৎস থেকে আসে। অর্থাৎ তহবিলের জন্য তাদের ব্যাংকের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। লিজিং কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে স্থায়ী আমানত, মেয়াদি আমানত ও কলমানির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করত। গত দুই বছর ধরে বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে নেওয়া আমানত ও কলমানিতে নেওয়া ধার সময়মতো পরিশোধ করতে পারছিল না। পরে বাধ্য হয়ে দফায় দফায় এগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার পরও তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নালিশও করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এগুলো নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এতেও অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংকেত পেয়ে ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) রিপোর্ট করেছে। ফার্স ফাইন্যান্সের ৩০ কোটি টাকার একটি এফডিআর বন্ধক রেখে প্রাইম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩০ কোটি টাকা করে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এই ঋণ পরিশোধে প্রথমে ব্যর্থতা, পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে নিষ্পত্তি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নতুন আমানত রাখা, আগের আমানতের মেয়াদ বাড়ানো এবং কলমানিতে অর্থ ধার দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের বড় উৎস সঙ্কুচিত হয়ে গেলে তারল্য সংকট বেড়ে যায়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বিনিয়োগ কমেছে : ২০১৯ সালে মোট ঋণ ও লিজ ছিল ৬৭ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। গত বছরের তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ২০ কোটি টাকায়। অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার ৮১০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকায়। আমানত ৪৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।