August 27, 2026, 11:18 pm

বন্ড নিয়ে দুশ্চিন্তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বন্ড নিয়ে দুশ্চিন্তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

সরকারি বন্ডের ‘সুদ আয়ের’ ওপর উৎসে কর আরোপের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বেসরকারি বিনিয়োগে। এতে আবারও বাড়বে ব্যাংক ঋণের সুদের হার। পাশাপাশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বেশি হবে। সার্বিকভাবে বেড়ে যাবে সরকারের ব্যয়ও। এছাড়া উৎসে কর কর্তনে দেশে বন্ড মার্কেট উন্নয়নে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। অনেক বিনিয়োগকারী বন্ড কিনতে নিরুৎসাহিত হবেন। এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই চিঠিতে সরকারি সিকিউরিটিজে (বন্ড) সুদ আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা) শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বন্ড সুদ আয়ের ওপর উৎসে কর প্রত্যাহার চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত কিছু না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা যাবে না, এটি প্রক্রিয়াধীন। চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হলেও কেবল জানা যাবে বা বলা যাবে। সূত্রমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত অর্থ আইন, ২০২০ এর আওতায় সরকারি বন্ড থেকে যে আয় হবে তার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ড বাজার নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছে। প্রথমে এর নেতিবাচক দিক তুলে ধরে এই কর প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানোর পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো কিছু অবহিত করেনি। ১৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফা চিঠি দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে একই অনুরোধ জানায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, শঙ্কার বিষয় হচ্ছে- বন্ড সুদ আয়ের ওপর উৎসে কর কাটার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে এ খাতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে বন্ড মার্কেট উন্নয়নে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এমন পরিস্থিতিতে আরও কয়েকটি আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বন্ড কেনায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। কারণ সরকার বন্ড খাত থেকে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর অর্থ না পেলে তখন ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ গ্রহণ করবে। এতে ব্যাংকিং খাতে সরকারের ঋণ নির্ভরশীলতা পুনরায় বৃদ্ধি পেতে পারে। আর ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বেসরকারি ঋণের ওপর। তখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়ার ফান্ডও কমে যাবে। আর বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত ঋণ না গেলে বিনিয়োগও হবে না।

চিঠিতে আরও বলা হয়, এসব উদ্যোগের ফলে বাজারে বিনিয়োগকারী কমে গেলে সরকারি বন্ডের চাহিদাও উল্লেখ্যযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। আর বন্ডের চাহিদা কমে গেলে সরকারের কাছে ব্যাংক ঋণের চাহিদা বাড়বে। এতে ঋণের সুদের হারও ফের উল্লেখ্যযোগ্য হারে বাড়তে পারে মর্মে প্রতীয়মান হয়। এতে সরকারের কস্ট অব ফান্ড ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একসময় শুধু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকারি বন্ড ক্রয় করত। এজন্য ব্যাংক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হতো সরকারকে। এটি বিবেচনায় নিয়ে বন্ডের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে বীমা প্রতিষ্ঠান, ভবিষ্যতহবিল, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, পেনশন তহবিলসহ নানা ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিকে বন্ড কেনার জন্য অর্ন্তভুক্ত করা হয়। এছাড়া অনিবাসী বা বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শুধু ট্রেজারি বন্ড কিনতে পারেন। ফলে বাজারে বিনিয়োগকারী বৃদ্ধির কারণে এর চাহিদাও বেড়ে যায়। চাহিদার কারণে সরকারের কস্ট অব ফান্ড উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যেমন ৬ বছর আগে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদ হার ছিল ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। এখন সেটি ৯ শতাংশ। প্রসঙ্গত, বন্ড ইস্যু করে ঋণ নেয়া হয়। বন্ডের ক্রেতা হচ্ছেন ঋণদাতা। আর বন্ড ইস্যুকারী ঋণগ্রহীতা। শেয়ারের মতো বন্ডেরও প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেট আছে। সরকার যে বন্ড বাজারে ছাড়ে তাকে ট্রেজারি বন্ড বলে।

বিভিন্ন প্রকল্প, বিশেষ করে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প অর্থায়নের জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ফান্ডের দরকার হয়। ট্রেজারি বিল স্বল্পমেয়াদি হয়। মেয়াদ এক বছরের কম। বর্তমানে ১৪, ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল বাজারে চালু আছে। পক্ষান্তরে ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘমেয়াদি। বর্তমানে ২, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড বাজারে প্রচলিত আছে। এই বন্ডে ১ লাখ টাকা বা এর গুণিতক যে কোনো অঙ্ক মূল্যের সমপরিমাণ সরকারি ট্রেজারি বন্ড কেনা যায়। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বা ‘কুপন রেট’ বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত নিলামে ইলেকট্রনিক বিডিং সিস্টেমের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। সুদের হার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ‘মনিটরি পলিসি অ্যান্ড অপারেশন্স’ লিঙ্কে দেখানো আছে। ট্রেজারি বন্ডের সুদ প্রতি ছয় মাস অন্তর পরিশোধ করা হয়।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com