October 12, 2026, 3:02 am

বিদেশিদের বেতন-ভাতার প্রকৃত তথ্য গোপন থাকবে না

বিদেশিদের বেতন-ভাতার প্রকৃত তথ্য গোপন থাকবে না

দেশে বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বেতন কম দেখানোর পথ বন্ধ করতে চায় সরকার। এ জন্য ১০ বছর আগের একটি গাইডলাইন বা নির্দেশিকা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।

জানা গেছে, সংশোধিত নির্দেশিকায় একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সর্বনিম্ন অপারেটর থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ পর্যন্ত বেতনের একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। ওই সীমার নিচে বেতন দেখাতে পারবেন না কোনো বিদেশি নাগরিক বা তাঁর নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশে বিদেশি কোম্পানির শাখা, লিয়াজোঁ, প্রতিনিধি অফিস ও প্রকল্প অফিস স্থাপনের অনুমতি এবং বিদেশি নাগরিকদের কর্মানুমতি শীর্ষক এ নির্দেশিকার খসড়ায় বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়াটি ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও পোশাকশিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএসহ বিভিন্ন অংশীজনদের দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতামত পেলেই সেটি পাঠানো হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। এভাবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে নতুন নির্দেশিকা চূড়ান্ত করবে বিডা।

বিডার তথ্য অনুযায়ী ‘বাংলাদেশে বিদেশি কোম্পানির শাখা, লিয়াজোঁ, প্রতিনিধি অফিস ও প্রকল্প অফিস স্থাপনের অনুমতি এবং বিদেশি নাগরিকদের কর্মানুমতি’ শিরোনামের গাইডলাইনটি পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন অংশীজনের কাছে পাঠানো হয়েছে।

খসড়া গাইডলাইন বা নির্দেশিকায় বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি নাগরিকদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নাগরিকদের প্রথম শ্রেণিতে; মালয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনুরূপ অর্থনৈতিক অবস্থাপন্ন দেশগুলোকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে; আর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, কাতার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোকে তৃতীয় শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

বিডার তৈরি খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের নাগরিক বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে কাজ করলে তাঁর বেতন ২ হাজার ৫০০ ডলারের কম দেখানো যাবে না, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সোয়া দুই লাখ টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। একই পদে দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত দেশগুলো থেকে আসা নাগরিকের সর্বনিম্ন বেতন হতে হবে ২ হাজার ৮০০ ডলার বা ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। আর তৃতীয় শ্রেণি তথা উন্নত দেশগুলোর কোনো নাগরিকের ন্যূনতম বেতন হবে তিন হাজার ডলার (২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা)।

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা কান্ট্রি ম্যানেজার পদে দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের বেতন ২ হাজার ৩০০ ডলারের নিচে দেখানো যাবে না। একই পদে দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকা দেশগুলোর নাগরিকদের বেতন ২ হাজার ৪০০ ডলারের বেশি দেখাতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি তথা উন্নত বিশ্বের নাগরিকের বেতন হতে হবে ২ হাজার ৫০০ ডলারের ওপরে।

এভাবে প্রতিটি পদের বিপরীতে বেতনের একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যেমন নিম্ন পর্যায়ের পদগুলোর মধ্যে কর্মী, টেকনিশিয়ান, সুপারভাইজার, অপারেটর, ফোরম্যান বা সমমানের পদে দক্ষিণ এশীয় নাগরিকদের বেতন ন্যূনতম বেতন দেখাতে হবে ১ হাজার ৪০০ ডলার। এসব পদে দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের বেতন হতে হবে ১ হাজার ৫০০ ডলারের ওপরে। আর উন্নত বিশ্বের বা তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের বেতন কমপক্ষে ১ হাজার ৬০০ ডলার দেখাতে হবে।

বর্তমানে দেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বেতন ২০১১ সালের গাইডলাইন অনুযায়ী দেখানো হচ্ছে। কিন্তু তাঁরা যেটি দেখাচ্ছেন সেটি তাঁদের সত্যিকারের বেতন নয়। কারণ, বিগত ১০ বছরে সব পদেই বেতন বেড়েছে। কিন্তু কেউ তাঁর সত্যিকারের বেতন প্রকাশ করছেন না। অর্থাৎ বিদেশি নাগরিকেরা যা বেতন দেখান, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পান। বিদেশি নাগরিকেরা যাতে তাঁদের সত্যিকারের বেতন দেখান, সেটি নিশ্চিত করতেই পুরোনো গাইডলাইন সংশোধন করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিডার পরিচালক আরিফুল হক বলেন, ২০১১ থেকে ২০২১ সাল—এই এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বেতনও বেড়েছে। কিন্তু তার আসল চিত্র উঠে আসছে না। সে জন্য গাইডলাইন সংশোধন করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি পদের বিপরীতে সর্বনিম্ন বেতনের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

বিডার কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি নাগরিকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার তথ্য কর্মানুমতির আবেদনপত্রে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। তাঁরা বলেন, বেতন-ভাতা নিয়ে বিভ্রান্তি পরিহার করতে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, মাথাপিছু আয় ও নাগরিকদের পদমর্যাদা অনুসারে ন্যূনতম বেতনকাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এই মানদণ্ড সবাইকে মানতে হবে।

এদিকে খসড়া গাইডলাইন বা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি মালিকানাধীন সব শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির জন্য একটি ডেটা ব্যাংক স্থাপন করা হবে, যেখানে এ দেশে কর্মরত সব বিদেশি নাগরিকের হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করা হবে। সরকারের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি ডেটা ব্যাংকে সংরক্ষিত তথ্য–উপাত্ত সময়ে সময়ে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ওই ডেটা ব্যাংকের লিংক স্থাপন করা হবে, যাতে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রয়োজনবোধে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com