October 10, 2026, 8:17 pm
একদিকে করোনার দ্বিতীয় আঘাত অন্যদিকে ভয়াবহ আগুনে কারখানার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়ে বিপাকে পড়েছে মাদার টেক্সটাইল। এই মহামারী করোনার মধ্যে শ্রমিকদের না পারছেন চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে না পারছেন তাদের বেতন দিতে, এ নিয়ে হতাশ পরিবারসহ করোনায় আক্রান্ত মাদার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলিজা সুলতান।
তিনি বলেন, কারখানার ৫টি ইউনিটের মধ্যে তিনটিই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে তিনটি ইউনিটেরই উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে ব্যাংকঋণের চিন্তা অন্যদিকে হাজার হাজার শ্রমিক নিয়ে কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।
এলিজা সুলতান বলেন, নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও মিলটি উৎপাদন অব্যাহত রেখে দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অবদান রেখে আসছিল। আগুনে পুড়ে যাওয়াতে মেশিনসমুহের পুনঃ স্থাপন করার জন্য ৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন। যার সংস্থান করা আমাদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সরকারী কোন আর্থিক সহায়তা ছাড়া মেশিন আমদানি করে মেশিন পুনঃস্থাপন করে মিলটি চালু করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, মিলটি রক্ষা করতে না পারলে ব্যাংকে বৃহদাকার ঋণ পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে যাবে। বিলুপ্ত হয়ে যাবে ৬ হাজার লোকের কর্মসংস্থান, হারিয়ে যাবে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস। ফলে মিলটি পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং সদয় সহায়তা কামনা করছি।
সম্প্রতি, গাজিপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত মাদার টেক্সটাইলের কারখানা পরিদর্শন করে দেখা যায় আগুনে পোড়া গন্ধে চারদিকে একাকার হয়ে আছে। বড় বড় মেশিন পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। কোন কিছুই যেন আর ব্যাবহারের উপযোগী নেই।
করোনা সংকটেও কারখানাটি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ করে আসছিল। সরকার ঘোষিত প্রণোদনার কোনো সুযোগ না পাওয়া সত্তেও তারা যথারীতি ব্যাংকের কিস্তি ও তিতাস গ্যাসের সব বকেয়া পরিশোধ করে সুতার নিয়মিত মান বজায় রেখেছিল বলে জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলিজা সুলতান।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল হামিদ জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুর থানাধীন ছোট গোবিন্দপুর শ্রীপুর এলাকাস্থিত ‘মাদার টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড’ কারখানার টিনসেড ভবনের ব্লোরুমে বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত পৌণে ১১টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। সিলিংয়ে থাকা ডাষ্টের কারনে আগুন মুহুর্তের মধ্যে কারখানার ব্লোয়িং সেকশন, ড্রায়িং সেকশন ও কার্ডিং সেকশনে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কারখানার নিরাপত্তাকর্মীরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের জয়দেবপুর ও কাশিমপুর স্টেশনের একটি করে দুইটি এবং ডিইপিজেড স্টেশনের তিনটিসহ মোট পাঁচটি ইউনিট পর্যায়ক্রমে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় চার ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ততক্ষনে আগুনে কারখানার ব্লোয়ার মেশিন, ড্রায়িং মেশিন, কার্ডিং মেশিন, তুলাসহ বিভিন্ন মালামাল পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন পুরোপুরি নেভাতে সকাল ৮টা পর্যন্ত ড্যাম্পিংয়ের কাজ করেন। এতে হতাহতের কোন ঘটনা ঘটে নি।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানান গেছে, মাদার টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেড দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানীযোগ্য সূতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ঘন্টায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় তাদের। এছাড়া দৈনিক ১০০ টন সুতা উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন কারখানাটিতে ৬ হাজার লোকের কর্মসংস্থান। বর্তমানে কারখানাটি বন্ধ আছে। সরকারি পৃষ্টপোষকতা ছাড়া কারখানাটি চালু করা সম্ভব নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায় ১০০ টনের একটা অর্ডারও পেয়েছিল মিলটি। সাধারণত জুট কাপড় প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নানা রঙের রঙিন সুতা তৈরি করা কারখানাটি এখন বন্ধ রয়েছে। কারখানাটিতে মূলত ২০ ধরণের রঙিন সুতা তৈরি হয়। যা দেশীয় বাজারে ৮০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে থাকে। বর্তমানে কারখানাটি বন্ধ ফলে রঙিন সুতার দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। করোনা সংকটের কারণে এর আগে বন্ধ ছিল কারখানাটি। কালারভেদে পাউন্ড প্রতি রঙিন সুতার দাম ৪০ থেকে ৬০ টাকা। কিন্তু কারখানাটি বন্ধ থাকার কারণে প্রতি পাউন্ডে দাম বেড়েছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। তাই উৎপাদন বন্ধ থাকায় এবারও রঙিন সুতোর দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টেক্সটাইলটির পরিচালক (অপারেশন) মো. হানিফ বলেন, মাদার টেক্সটাইল দেশের অন্যতম বৃহৎ রফতানিযোগ্য সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এটি দৈনিক ১০০ টন সুতা উৎপাদন করতে পারে। এই কারখানায় ৬ হাজার লোকের কর্মসংস্থান। বর্তমানে কারখানাটি বন্ধ আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এটি চালু করা সম্ভব না।
তিনি জানান, করোনাকালীন সময়ে সরকারের প্রণোদনা না পাওয়া সত্ত্বেও শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ভাতা, বকেয়া গ্যাস বিল এবং ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামিন সাংবাদিকদের বলেন, মাদার টেক্সটাইল দেশীয় বাজারে মোট সুতার বড় অংশ সরবরাহ করে থাকে, এটি সত্য। তিনি বলেন, ছবিতে মাদার টেক্সটাইলের আগুনের যে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি দেখলাম, তাতে মনে হচ্ছে সহসাই মেশিনারিজ রিপ্লেস করা সহজ হবে না। কারণ করোনার কারণে অনেক কিছুই আমদানি করা কঠিন হয়ে গেছে।
বিজনেস নিউজ/ এমআরএম