May 27, 2026, 5:16 pm
করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের আর্থিক অবস্থা শঙ্কার মুখে পড়েছে। ধারাবাহিকভাবে প্রবাসী আয়, আমদানি-রফতানিতে বিশাল তফাত এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে রিজার্ভ কমছে দ্রুত। এবার সে ধারায় যোগ দিয়েছে সঞ্চয়পত্র। গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রে নতুন করে বিনিয়োগ করার চেয়ে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদকৃত তথ্য মতে, গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে বিনিয়োগের চেয়েও ৪৩৬ কোটি টাকা বেশি তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। ডিসেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগ হয়েছে ৭ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা আর তোলা হয়েছে ৭ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান মতে, দেড় বছর পর আবার ঋণাত্মক বিনিয়োগ হয়েছে সঞ্চয়পত্রে। এরকম সর্বশেষ হয়েছিল করোনার প্রথম বছর ২০২০ সালের এপ্রিলে। সেবার সঞ্চয়পত্রের মোট বিনিয়োগের তুলনায় ৬২২ কোটি টাকা বেশি মূল ও মুনাফা পরিশোধে ব্যয় হয়েছি সরকারের।
এক অঙ্কের সুদ সীমার কারণে ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন গ্রাহকরা। এর কারণে গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রের দিকে বেশি বিনিয়োগ করেছিলেন। ফলে বেড়ে গিয়েছিল সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগও কমে যাচ্ছে। মানুষ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের চেয়ে প্রত্যাহার করছেন বেশি হারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করোনার প্রাদুর্ভাবে গেল ২ বছরে দেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর আয় কমে গেছে। এ কারণে অনেকেই আর সঞ্চয় করতে পারছেন না। কেউ কেউ অর্থ তুলে নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনায় নতুন করে সরকারের দেওয়া বেশকিছু বিধিনিষেধ গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করছে। সব মিলেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। যেমন সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ১ শতাংশ এবং ৩০ লাখ থেকে ৪৫ লাখ টাকা বা এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে বাধ্যতামূলকভাবে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগের ওপর টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর থেকেই বিনিয়োগ কমতে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত আগস্টে সরকারের সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। এক মাস পর সেপ্টেম্বরে নিট ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, অক্টোবরে এসে আরও ব্যাপক হারে কমে নিট ঋণের পরিমাণ। সে মাসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৬৬ কোটি টাকা। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে নভেম্বরেও। নভেম্বরে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এসে এক টাকাও নিট ঋণ না নিয়ে পরিশোধ বেশি করেছে ৪৩৬ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ কমে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার হার বেড়ে যাবে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমনিতেই ডলারের সঙ্কটের কারণে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে ডলার কিনছে। পাশাপাশি করোনাভাইরাসের প্রভাবে পুরনো ঋণ আদায় কমে গেছে। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে সামগ্রিক আমদানি ব্যয়। এমনি পরিস্থিতিতে ব্যাংকের নগদ টাকার প্রবাহ কমে গেছে। সব মিলে চাপে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। এ অবস্থায় ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ দেওয়ার সক্ষমতা ব্যাংকগুলোর কমে যাবে।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে গত বছরে বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই উদ্বৃত্ত অর্থ ছিল। এ কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাতে সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করেছিল। এতে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থের বড় একটি অংশ সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে আটকে গেছে।
অপরদিকে বিনিয়োগ স্থবিরতার মাঝে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাতে আমানতের সুদ হার কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একপর্যায়ে আমানতের সুদ হার ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসে। বিপরীতে সঞ্চয়পত্রের সুদ হার ১১ শতাংশের ওপরে ছিল। সাধারণ আমানতকারীরা বেশি মুনাফার আশায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে থাকে। ফলে গত অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে যেখানে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে বছর শেষে এ খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয় ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩২ হাজার কোটি টাকা