August 18, 2026, 3:40 pm

সিনহা হত্যার রায় আজ

সিনহা হত্যার রায় আজ

বহুল আলোচিত সেনাবাহিনীর স্বেচ্ছায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারের পরিকল্পনায় হত্যা করা হয়েছিল বলে র‌্যাবের দেওয়া চার্জশিট (অভিযোগপত্র) থেকে জানা যায়। সিনহা হত্যাকাণ্ডের চার মাস পরেই র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিলে সেখানে হত্যাকাণ্ডে আসামিদের কার কী ভূমিকা বা অপরাধ ছিল তা উল্লেখ করা হয়। মূলত ওই অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তিতর্ক খণ্ডন শেষে আজ সোমবার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। ফলে দেশ-বিদেশে আলোচিত মেজর সিনহা হত্যা মামলার রায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ রোডের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় তড়িঘড়ি করে পুলিশ বাদী হয়ে সিনহার সহযোগীদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করে। পরে ওই বছর ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন মেজর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস।

এই হত্যা মামলা এবং পুলিশের করা তিনটি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। দায়িত্ব পাওয়ার পর সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ মোট ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে ২৬ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দেন র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা ও র‌্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. খায়রুল ইসলাম। একই সঙ্গে পুলিশের করা তিনটি মামলাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে ওইসব মামলা থেকে আসামিদের (সিনহার সহযোগীরা) অব্যাহতির আবেদন জানানো হয়। এর মধ্যে মেজর সিনহা হত্যা মামলায় সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে।

এরপর ২০২১ সালের ২৭ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন (অভিযোগ) করা হয়। ২৩ আগস্ট থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। যা শেষ হয় গত ১ ডিসেম্বর। এরপর ১৫ আসামির মধ্যে ১২ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামি কক্সবাজার কারাগারে রয়েছে। রায়ে আগে তাদের আদালতে হাজির করা হবে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে মোট ১৫ আসামির মধ্যে পুলিশ সদস্য রয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন- বরখাস্ত হওয়া টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, এসআই মো. শাহজাহান আলী, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল রুবেল শর্মা, কনস্টেবল সাফানুল করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাগর দেবনাথ, রাজীব হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ইমন। এ ছাড়া অন্য তিনজন আসামি টেকনাফ থানা পুলিশের সোর্স ও সাজানো মামলার সাক্ষী। তারা হলেন- নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও আইয়াছ উদ্দিন। বর্তমানে ওই ১৫ আসামিই কারাগারে আছেন। কনস্টেবল সাগর দেবনাথ প্রথমদিকে পলাতক থাকলেও সর্বশেষ তিনি আত্মসমর্পণ করেন। আজ রায় ঘোষণা করা হলে সব আসামিকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।

কোন আসামির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

প্রদীপ কুমার দাশ : সিনহা হত্যার ওই সময়ে টেকনাফ মডেল থানার সাবেক ওসি ছিলেন প্রদীপ কুমার দাশ। তিনি মেজর সিনহা হত্যা মামলার এজাহারের ২ নম্বর আসামি। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রদীপের বিরুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে হত্যার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, প্ররোচনা ও জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। হত্যার আগে মেজর সিনহাকে কক্সবাজার ছাড়তে হুমকিও দিয়েছিলেন ওসি প্রদীপ। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

লিয়াকত আলী : তৎকালীন টেকনাফ থানার বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী সিনহা হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, প্রদীপের নির্দেশনায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মেজর সিনহাকে গুলি করে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন লিয়াকত আলী। লিয়াকত মূলত ওসি প্রদীপের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ স্থাপন করে পুরো হত্যাকাণ্ডের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

নন্দদুলাল রক্ষিত : নন্দদুলাল রক্ষিত বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি মামলার ৩ নম্বর আসামি। নন্দদুলালের বিরুদ্ধে পরিদর্শক লিয়াকত আলীর সহযোগী হিসেবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সিনহা হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়াও ওসি প্রদীপের কথামতো সিনহার প্রাইভেটকার থেকে ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার না হওয়া সত্ত্বেও ভুয়া জব্দ তালিকা করেন নন্দদুলাল। পাশাপাশি মেজর সিনহার সঙ্গে থাকা হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী সিফাতের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে মিথ্যা মামলা করেছিলেন এসআই নন্দদুলাল।

পুলিশের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ : এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন আজাদ ও আব্দুল্লাহ আল মামুন বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চার্জশিটে তাদের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে- তারা আহত গুলিবিদ্ধ সিনহাকে যেন কেউ সাহায্য করতে না পারে সে জন্য অস্ত্রসহ ঘটনাস্থল পাহারা দেন। তারা নাক, চোখ বেঁধে সিনহার সঙ্গী সিফাতকে নির্যাতনে সহায়তা করেন। হাসপাতালে নেওয়ার সময় এই চার আসামি নিথর সিনহাকে বস্তার মতো ছুড়ে গাড়িতে তোলেন।

অন্যদিকে কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেবনাথ টেকনাফ মডেল থানায় ওই সময়ে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ওসি প্রদীপের করা শতাধিক বন্দুকযুদ্ধে এই দুই কনস্টেবল সশরীরে অংশগ্রহণকারী। এ ছাড়া মেজর সিনহা হত্যার ঘটনার দিন মাদক নাটক সাজানো, সিফাতকে মারধর এবং ওয়াটার থেরাপি দিয়ে নির্যাতন করেন রুবেল শর্মা ও সাগর দেবনাথ।

এ ছাড়া এপিবিএন’র এসআই মো. শাহজাহান আলী, কনস্টেবল রাজীব হোসেন এবং আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ইমন এই তিনজন ঘটনার রাত ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসআই মো. শাহজাহান আলী সিফাতকে রশি দিয়ে বেঁধে এবং অন্য দুজন সিনহার পড়ে থাকা দেহ ঘেরাও করে রেখে হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেছেন।

পুলিশের সোর্স ও বানোয়াট সাক্ষীদাতা তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ : নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও আইয়াছ উদ্দিন টেকনাফ থানা পুলিশের সোর্স এবং সাজানো মামলার সাক্ষী। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এই তিনজন ঘটনার শুরুতে ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন। সিনহাকে ডাকাত সাজিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে সিনহার চলাচলের খবর লিয়াকতকে ফোনে জানিয়ে দেন। পরিকল্পনা ও যোগসাজশের মাধ্যমে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটান।

ঘটনাপ্রবাহে যা পাওয়া যায় : সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ৭ জুলাই সিনহা মো. রাশেদ খান, তার সহযোগী শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম (সিফাত) ও তাহসিন রিফাত নুরকে সঙ্গে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উদ্দেশ্যে কক্সবাজারের নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। সে সময় ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার সৃষ্টি হয়। ওই সময়ে স্থানীয় নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে ইয়াবা ব্যবসা, ওসি প্রদীপ সিন্ডিকেডের কাছে জিম্মি হওয়া ও অত্যাচারের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন।

এসব বিষয়ে ওসি প্রদীপের কাছে জানার জন্য ক্যামেরা ও ডিভাইসসহ সিনহা, শিপ্রা ও সিফাত টেকনাফ থানায় যান। ওই সময় থানায় ওসি প্রদীপ হুমকি দিয়ে তাদের অনতিবিলম্বে টেকনাফ বা কক্সবাজার ছেড়ে যেতে বলেন। তা না হলে ‘তোমাদের আমি ধ্বংস করে দেব’ বলেও হুমকি দেওয়া হয়।

কিন্তু ওসি প্রদীপের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণেই ষড়যন্ত্র করে মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এক পর্যায়ে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় মেজর সিনহাকে। হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ পরেই প্রদীপ কুমার দাশ যখন ঘটনাস্থলে যান, তখনও মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন। র‌্যাব বলেছে, ওসি প্রদীপ তখন তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে লোক দেখানোর জন্য তাকে একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com