May 25, 2026, 6:27 am

ঋণখেলাপির আগেই অবলোপন চায় ইডকল!

ঋণখেলাপির আগেই অবলোপন চায় ইডকল!

নিয়ম অনুযায়ী খেলাপির তিন ধাপ পার করে আরও তিন বছর অনাদায়ী অবস্থায় থাকা ঋণ অবলোপন করা যায়। এর আগে অবলোপনের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ঋণমান খারাপ হওয়ার আগেই তা মূল খাতা বা ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দিতে চায়  ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিতরণকৃত এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে ৭০০ কোটি টাকা অবলোপন এবং এর সুদ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানাটি। তবে এসব টাকা সরকারকে ফেরত দেয়ার জন্য আরও সাত বছর সময় পাবে ইডকল।

সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য অনুমতি চেয়ে চিঠি দিয়েছে ইডকল। কোম্পানির ২৭৬তম বোর্ড সভায় এসব টাকা মাফ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পর্ষদ।

সূত্রমতে, ২০০৩ সালে সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) প্রোগ্রাম শুরু করে ইডকল। মাঝে তাদের সর্বোচ্চ বিতরণ স্থিতি দাঁড়িয়েছিল সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এসএইচএস প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইডকলের বিতরণকৃত ঋণের বর্তমান স্থিতি এক হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। কিন্তু সবগুলোই খেলাপির পথে, আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম।

এর আগেও এই প্রোগ্রামের আওতায় ১৯৫ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) প্রোগ্রামে ঋণ দেয়া ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৯টিরই অবস্থা ভালো যাচ্ছে না।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হিলফুল ফুজুল সমাজ কল্যাণ সংস্থাসহ দুটি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি, যাদের বিষয়ে আদালতে মামলা চলছে। ইডকল সূত্রে জানা যায়, এসব ইচ্ছাকৃত খেলাপির পেটে গেছে ১২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে হিলফুল ফুজুলের পেটেই গেছে ১১৮ কোটি টাকা। অপর প্রতিষ্ঠান মাকস রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি লি. নিয়ে গেছে তিন কোটি টাকা।

ইডকলের দেয়া চিঠিতে বলা হয়, এক বছরের কিস্তি পরিশোধের ধরন দেখে গ্রামীণ শক্তি, রুরাল সার্ভিস ফাউন্ডেশন (আরএসএফ) ও সৃজনি বাংলাদেশ-এর ঋণ অবলোপন ও সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। এছাড়া আরও দুটি প্রতিষ্ঠান জিএইচইএল এবং বিআরআইডিজিই’র ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী, এসব ঋণ ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দিতে হলে খেলাপি অবস্থায় থাকতে হবে তিন বছর, যা আগে ছিল পাঁচ বছর। এরপর শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করার শর্ত রয়েছে। কিন্তু ইডকলের দাবি, হিলফুল ফুজুল সমাজ কল্যাণ সংস্থাসহ দুটো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃত খেলাপি। অন্য প্রতিষ্ঠান এখনও খেলাপি হয়নি। সুতরাং আইন অনুযায়ী যেখানে খেলাপি হয়নি, সেখানে অবলোপনের কোনো সুযোগ নেই।

ব্যাংকবহির্ভূত এই সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের ঋণমান ভালোই ছিল, কিন্তু বছরের ব্যবধানে খেলাপির হার বেড়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি। আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ছিল এক দশমিক ৫৮ শতাংশ। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১৫ সালে ছয় দশমিক ২২ শতাংশে গিয়ে ঠেকে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের হার। এরপর আরও লাফিয়ে ২০১৬ সালে খেলাপি আট দশমিক ৭০ এবং ২০১৭ সালে পৌঁছায় ১০ দশমিক ৯১ শতাংশে। ২০১৮ সালে আবার কিছুটা কমে আসে (সাত দশমিক ১৫ শতাংশ) তাদের খেলাপি ঋণ।

বার্ষিক প্রতিবেদনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ শেষে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের হার চার দশমিক ৫৪ শতাংশ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রস্তুত করা রেড জোনের তালিকায় উঠে এসেছে ইডকলের নাম। কিন্তু রেড জোন নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয় সংস্থাটি। কারণ হিসেবে তারা বলছে, এটি একটি কাগুজে হিসাব।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইডকলের নির্বাহী পরিচালক ও সিইও মাহমুদ মালিক বলেন, ঋণগুলো অবলোপনের আবেদন করেছি ঠিকই। কিন্তু এখনও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। ভালো মানের ঋণ অবলোপনের কোনো নিয়ম নেই, তবে জাতীয় বিবেচনায় আমাদের মাধ্যমে এর উদাহরণ তৈরি হতেই পারে। কারণ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের আনাচে-কানাচে আলো পৌঁছে দিয়েছি আমরা, যার মাধ্যমে সরকারের কেরোসিন খরচ কমে তলানিতে নেমেছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন কারণে সৌরবিদ্যুতের সংযোগ আর নিতে চাচ্ছে না সাধারণ জনগণ। আগের কিস্তিও ঠিকমতো পরিশোধ করছে না। মাঠপর্যায়ে যেসব টাকা আটকে আছে, তা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই টাকাগুলো আগে থেকেই অবলোপনের আবেদন করেছি সরকারের কাছে।

সিইও আরও বলেন, সরকার থেকে ঋণ নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে ইডকল। এসব ঋণের বড় অংশ আদায় হলেও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এই টাকা অবলোপন এবং সুদ মওকুফের জন্য আবেদন করা হয়েছে। আগামী সাত বছরের জন্য এই সুবিধাটি চাওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিষয়ে তিনি বলেন, হিলফুল ফুজুল সমাজ কল্যাণ সংস্থা একটি ইচ্ছাকৃত খেলাপি। পাঁচ বছর আগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে রেখেছি। অনেক আগে থেকেই তারা কিস্তি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণ আদায় হবে কি না, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আগে থেকে কীভাবে বলতে পারে। যেকোনোভাবে টাকাগুলো আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। এটার মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে ভুল বার্তা যাবে। এসব খবর শুনে যাদের টাকা ফেরত দেয়ার সামর্থ্য আছে তারাও টাকা দেবে না। খেলাপি ঋণই ঠিকমতো আদায় করে না প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু অবলোপন হলে সে টাকা আরও আদায় হবে না। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ভালো পর্ষদ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

বিজনেস নিউজ/এমআরএম

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com