May 31, 2026, 8:58 am

করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় ব্যাংকগুলো

করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় ব্যাংকগুলো

মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। থমকে দাঁড়ায় জনজীবন। অর্থনীতির চাকাও একপ্রকার থেমে যায়। সাধারণ ছুটির মধ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম চললেও মহামারির থাবা থেকে রক্ষা পায়নি অধিকাংশ ব্যাংক। লকডাউন ওঠার পর ধীরে ধীরে সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) যেখানে তালিকাভুক্ত ১৭টি ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমে গিয়েছিল, সেখানে সেপ্টেম্বর শেষে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৯টিতে। একইভাবে ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হয়ে পড়া ব্যাংকের সংখ্যাও কমে গেছে। সেপ্টেম্বর শেষে ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে ১০টির। জুন শেষে এ সংখ্যা ছিল ১৭টি।

বিশ্লেষক ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে সার্বিক অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তার ধাক্কা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। লকডাউনের পর সবকিছু খুলে দেয়া হলেও অর্থনীতি তার হারানো গতি ফিরে পায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলেও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। থমকে যাওয়া অর্থনীতিতে কিছুটা গতি বাড়ায় ব্যাংকেও তার সুফল পড়েছে। আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কেউ কেউ বলছেন, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন দেখে ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। কারণ এই আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষিত না হওয়ায় কোনো কোনো ব্যাংক ঠিকভাবে প্রভিশন না রেখে মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে। ফলে বছর শেষে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো কোনো ব্যাংকের মুনাফা কমে আসতে পারে। সুতরাং ব্যাংকের উচিত প্রতিটি প্রান্তিকেই সঠিকভাবে প্রভিশন সংরক্ষণ করা। এতে মুনাফা কিছুটা কমলেও ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো হবে।

সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উত্তরা ব্যাংক, ইউসিবি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক- এই ১০টি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম, এবি, ঢাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউসিবি, সোস্যাল ইসলামী ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ক্যাশ ফ্লো জুন শেষেও ঋণাত্মক ছিল।

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ক্লাশ ফ্লো ঋণাত্মক হয়ে পড়ার পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও ইউসিবি’র মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে।

মুনাফা কমে যাওয়া অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে- সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, আইএফআইসি, এনসিসি এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক। এর মধ্যে মুনাফায় সব থেকে বেশি ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে আইএফআইসি ব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৭৬ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ টাকা ৩২ পয়সা। এরপর রয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ৭২ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২ টাকা ২৫ পয়সা।

এদিকে গত বছরের তুলনায় মুনাফা বাড়া ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে- এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক।

ইস্টার্ন ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। আইসিবি ইসলামী ব্যাংক বরাবরের মতো লোকসানে রয়েছে। গত বছরের তুলনায় ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ কমেছে। চলতি বছরের ৯ মাসের ব্যবসায় ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৫ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় ৪৯ পয়সা। লোকসানের পাশাপাশি কোম্পানিটির সম্পদের মূল্যও ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১৭ টাকা ৪১ পয়সা।

ব্যাংকগুলোর এমন চিত্র সম্পর্কে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ইবিএল’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলী রেজা ইফতেখার বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে একটু সময় লাগবে। সবকিছু খুলে দিলেও অর্থনীতির হারানো গতি সহসা ফিরে আসবে না। তার পরও মে-জুন-জুলাই’র তুলনায় এখন পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। আমার ধারণা, আগামী বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে অবস্থা আরও ভালো হবে।

ব্যাংকের মুনাফার বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যাংক প্রভিশন কম করলে নিট মুনাফা একটু বাড়বে। আমি মনে করি, প্রভিশন না করে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। বরং প্রভিশন করলে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো হবে। ব্যবসা করতে হলে প্রতিটি প্রান্তিকেই প্রভিশন করা উচিত। প্রভিশনের সুবিধা হচ্ছে ব্যাংক থেকে টাকা বের হয়ে যায় না।

এবিবি’র সাবেক সভাপতি আনিস এ খান বলেন, কোভিডের কারণে আমরা দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখনও অনেক লোক ব্যাংকে যেতে পারেন না। সিনিয়ররা বাসা থেকে কাজ করেন। আসলে ব্যাংক চলে অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে। লকডাউনের জন্য আমাদের অর্থনীতি নিচে নেমে গিয়েছিল, ব্যাংকও নিচে নেমে গিয়েছিল। একসঙ্গে সবগুলো তো রিকভারি করে না। একটু সময় লাগবে। আসল অবস্থা বোঝা যাবে অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর— এই তিন মাসের ফলাফলের ওপর।

তিনি আরও বলেন, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকেই কিছু ইম্প্রুভ (উন্নতি) দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু ব্যাংকের শক্তিশালী রিজার্ভ ও শক্তিশালী নেতৃত্ব আছে, তারা রিকভারি করেছে। কিছু কিছু ব্যাংকের বিগ (বড়) লিডারশিপ (নেতৃত্ব) এবং বিগ ক্যাপিটাল (বড় মূলধন) আছে; তাদের রিকভারি করতে একটু সময় লাগবে।

বিজনেস নিউজ/এমআরএম

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com