May 25, 2026, 4:17 pm

ভাড়া কমানোর পরও ভাড়াটিয়া পাচ্ছেনা বহু বাড়িওয়ালা

ভাড়া কমানোর পরও ভাড়াটিয়া পাচ্ছেনা বহু বাড়িওয়ালা

ঢাকার গ্রিন রোডের একজন বাড়িওয়ালা মিলন আহমেদ। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে এই বাড়ির মালিকানা পেয়েছেন এক যুগ আগে। সেই থেকে বাড়ির আয় তার পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। হঠাৎ করে করোনার ছোবলে বিপাকে পড়েছেন এই বাড়িওয়ালা। কারণ তার অনেক ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে মাস তিনেক আগে। সেসব ফাঁকা ফ্ল্যাট এখনো ভরাতে পারছেন না মিলন।

মিলন বলেন, আমার তিনতলা বাড়ির কয়েকটা ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে গেছে। করোনার কারণে অনেক ভাড়াটিয়া বাড়ি চলে যাবেন বলে বাসা ছেড়ে দেয়। মাস চারেক আগে প্রথম একটি ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়। এরপর মাস দুয়েকের ব্যবধানে আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে যায়। আগে যে ভাড়া নিতাম সেটা থেকে কিছু কমিয়ে দেয়ার পরও ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না।

মিলনের মত বাসাভাড়ার টাকায় সংসার চালান রাজধানীর মহাখালী এলাকার একটি পাঁচতলা বাসার মালিক আফজাল হোসেন। বাসাটিতে ২০ পরিবারের বসবাস ছিল। বর্তমানে ১৪টি পরিবার আছে।

আফজাল হোসেন জানান, বর্তমানে তার পাঁচটি ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে। ভাড়ায় কিছুটা ছাড়ের ব্যবস্থা করেও তিনি ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না।

রাজধানীর ধানমন্ডির কলাবাগান বসিরউদ্দিন রোড মসজিদের পাশে বড় চারটি ভবনের সামনে ঝুলছে ‘টু-লেট’। প্রতিটি ভবনে চার থেকে পাঁচটি ফ্ল্যাট খালি। কলাবাগান এলাকার অধিকাংশ বাসার সামনে টু-লেট সাঁটানো রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এই টু-লেট আধিক্য দেখা যায় খিলক্ষেত, উত্তরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ প্রায় পুরো রাজধানীতেই।

দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। করোনা শনাক্তের ১৮ দিন পর গত ২৬ মার্চ সরকার প্রথম সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এতে করে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্ধ রাখতে হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। এই ছুটি টানা কয়েক ধাপে বাড়ানো হয়। প্রায় ৬৬ দিন পর প্রথম স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিস খোলার সিদ্ধান্তে সরকারি অফিসের সঙ্গে বেসরকারি অফিসগুলো একে একে খুলতে শুরু করে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাড়িতে বসেই কার্যক্রম চালানো বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বেতন কর্তন শুরু করে। শুধু তাই নয়, এ সময়ে অনেকের চাকরি চলে যায়।

ফলে রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বসবাসরত অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে তুলনামূলক কম ভাড়ার এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যায়। আবার সাময়িক পরিস্থিতি বিবেচনাসহ সন্তানদের স্কুল বন্ধ থাকার কারণে কেউ কেউ পরিবার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আবার অনেকেই চাকরি হারিয়ে একেবারে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার তথ্য রয়েছে।

সাভারে একটি প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টসে ভালো বেতনের এক চাকুরে আনোয়ার হোসেন বলেন, পরিবার নিয়ে উত্তরায় থাকতাম। করোনা ইস্যুতে অফিস বেতন কাটার কারণে বাসা পরিবর্তন করে টঙ্গীর দিকে বাসা নেই। আপাতত আরও কিছু সময় এদিকে থাকব। অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হলে আবার ভালো এলাকায় যাবার চিন্তা আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান ও উত্তরাসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকার বেশির ভাগ বাড়িতে কিছু না কিছু ফ্ল্যাট করোনার কারণে খালি হয়ে গেছে। প্রায় কয়েক মাস কেটে গেলেও সেসব ফ্ল্যাট ভরানো যাচ্ছে না।
এসব ফাঁকা ফ্ল্যাট ভরানো নিয়ে বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আশপাশে গড়ে ওঠা মুদিসহ বিভিন্ন কনফেনশনারি ব্যবসাও।

ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের কয়েকটি ফ্ল্যাটবাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক মুদি দোকানি বলেন, আমার ব্যবসাই হচ্ছে এখনাকার ফ্ল্যাটবাড়ি ঘিরে। করোনার কারণে অনেক পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। খালি ফ্ল্যাটের কয়েকটাতে নতুন ভাড়াটিয়া আসছে, তবুও অনেকগুলো ফ্ল্যাট এখনো খালি। এতে করে আমার ক্রেতার পরিমাণ কমে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

কাঁঠালবাগানের একটি ফ্ল্যাটের সঙ্গে লাগোয়া এক নারী দর্জি জানান, করোনার আগে তিনি বেশ অর্ডার পেতেন আশপাশের ফ্ল্যাট থেকে। কিন্তু এখন তা অনেক কমে গেছে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, করোনায় অর্থনীতিতে যে প্রভাব ফেলেছে এই পরিস্থিতি সেটার একটা প্রতিফলন। যে লোকটা বাড়িভাড়া দিতে না পেরে কম মূল্যের বাসায় বা গ্রামে ফিরে গেলেন, তার জীবনমান নেমে যাবে। একই সঙ্গে বাড়িওয়ালারও জীবনমান নামবে।

সিপিডির ফেলো, অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন মানুষের আয় কমে গেছে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তের। অনেকে ছোট ছোট ব্যবসা করতেন সেগুলো এখনও সচল করতে পারেননি। করোনায় অর্থনীতির যে প্রভাব সেটার প্রতিফলন এটা। ফলে আমাদের অর্থনীতিতে একটা প্রভাব পড়বে। যারা বাড়ি ভাড়া দিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করত তাদের জন্য এটা অর্থনৈতিক সমস্যা। আবার অনেকে এই টাকা দিয়ে ব্যবসা করতেন, এই টাকা ব্যাংকে রাখতেন কিংবা কিছু কিনতেন সেটার পারসেস যোগ হত।

রাজধানীর অভিজাত এলাকার চেয়ে বাসা ফাঁকা পড়ে থাকার করুণ চিত্র পাওয়া যায় নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের এলাকাগুলোতে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, হাজারীবাগ, মিরপুর ও বাড্ডা এলাকায় তূলনামূলক কম মূল্যের বাসায় থাকা নিন্ম আয়ের মানুষের আয় কমে যাওয়ায় অনেকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। এতে করে এসব এলাকায় অনেক বাসা ফাঁকা হয়ে গেছে।

মোহাম্মদপুর এলাকার মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড তিন নম্বর সড়কের ভবনমালিক মোরসালিন বাবু বলেন, আমার বাসায় ১৭টা রুম আছে। বাড়ি করার পর থেকে কখনও একটি রুমও ফাঁকা থাকতো না। এখন তিন মাস যাবত আমার চারটা রুম খালি যাচ্ছে। যে কয়টা রুম ভাড়া আছে সেগুলোর ভাড়া কমিয়ে দিয়েছি। নইলে ভাড়াটিয়ারা থাকতে চাচ্ছে না।

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের একটি বাড়ির নিরপত্তাকর্মী তৌহিদুজ্জামান তন্ময় বলেন, আগে টু-লেট না থাকলেও মানুষ আইস্যা বাসা খালি আছে কিনা জিজ্ঞেস করত। গত তিনমাস যাবত টু-লেট ঝুলে কিন্তু বাসা ভাড়া নিতে কেউ আসে না। ফাঁকা ফ্ল্যাট ভাড়া না হওয়ায় বাড়ির মালিক ঠিকমত বেতন দিতে পারছে না। বেতন ঠিক মত না হওয়ায় বৌ-পোলাপাইন গ্রামের বাড়ি পাঠাইয়া দিছি।’

সম্প্রতি বেসরকারি সংগঠন পিপিআরসি ও বি আইজিডির গবেষণার তথ্য বলছে, করোনাকালে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে অন্তত ১৬ শতাংশ দরিদ্র মানুষ। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ, যোগাযোগের ব্যয় এবং অন্য নানামুখী ব্যয় মেটাতে না পেরেই এসব মানুষ ঢাকা ছেড়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com