April 18, 2026, 9:06 pm

অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও গভীর সংকটে মধ্যবিত্তরা

অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও গভীর সংকটে মধ্যবিত্তরা

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যেভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিল, তা একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে। যদিও সব দেশ সেই অর্থে করোনার প্রকোপমুক্ত হয়নি।

অনেক দেশে ফের জোরালো হচ্ছে করোনার হানা। আমাদের দেশেও একই অবস্থা। এখানে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি না হলেও অর্থনীতির সবগুলো ক্ষেত্র খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এখনও ঢের সময় বাকি। এ অবস্থায় দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। আর সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে আছে মধ্যবিত্ত।

চাকরিচ্যুত ও কর্মহীন হওয়া বেকারের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি কর্মসংস্থানও কমেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ সংকটময়।

এ অবস্থায় অর্থনীতিকে পুরোপুরি সচল করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে তারা বলেছেন, চাকরিচুত্যদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আনতে হবে। দ্রুত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থাও করতে হবে।

তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, করোনার প্রভাবে মধ্যবিত্ত সংকটে পড়ায় দেশে বড় সমস্যা সৃষ্টি হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্তদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশেই নগদ সহায়তা দেওয়া হলেও আমাদের দেশে এ নিয়ে চিন্তা করা হয় না। তাদের জন্যও আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। সরকার মধ্যবিত্তদের জন্য একটি হেলপলাইন বা হটলাইন খুলতে পারে। যাদের সহায়তা দরকার তারা আবেদন করবে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে হবে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের অর্থনীতি পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ থেকে যাবে। অনেকেই চাকরি হারিয়ে ঝুঁকিতে আছেন বা বেতন কমে গেছে, এ সমস্যাটা থাকবে। এ অবস্থায় তাদের আয় বাড়াতে করোনা পরিস্থিতির উত্তরণ জরুরি। তাই সবার আগে করোনা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান লেঅফ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। সাময়িক ঋণ সুবিধা দিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের টিকে থাকার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নগদ সহায়তাও দেওয়া যেতে পারে।

পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময় লেগে যাবে। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে করোনার প্রকোপ আবার বাড়ছে। তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আবার বাণিজ্য বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দেবে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে মধ্যবিত্তদের ওপর। এর ফলে চাকরি হারানোসহ আয় কমে যাবে, আর আয় কমলে ক্রয়ক্ষমতাও কমে যাবে। কিন্তু দ্বিতীয়বারের মতো সরকারের আর সার্পোট দেওয়ার সামর্থ থাকবে না। এজন্য এই চাপটা তাদের নিতে হবে। যাদের বেতন কমেছে তাদের জন্য সরকার কিছু করবে না। তবে যাদের চাকরি চলে গেছে, তাদের জন্য সরকারের কিছু করার আছে।

তিনি বলেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি উপায় আছে, আর তা হলো অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে তা সম্ভব নয়। ফলে সবার আগে করোনা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া উচিত। টিকা পেলে আগামী বছরের মাঝামাঝি সবকিছু স্বাভাবিক হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যমতে, দেশের ১৬ কোটি মানুষের ৪ কোটি পরিবারের মধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ শতাংশ; উচ্চবিত্ত ২০ শতাংশ আর বাকি ৬০ শতাংশ নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জরিপ বলছে, ফরমাল সেক্টরে কাজ করা ১৩ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। ১১ হাজার টাকার কম আয়ের ৫৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৩২ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। ১৫ হাজার টাকা আয়কারী ২৩ দশমিক ২ শতাংশের আয় পুরো বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৪৭ দশমিক ২৬ শতাংশের আয় কমে গেছে। ৩০ হাজার টাকার বেশি আয়কারী ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশের কমেছে এবং ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশের আয় বন্ধ হয়ে গেছে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে ৩৬ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। তিন শতাংশের চাকরি থাকলেও বেতন পান না। এদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত। এছাড়া করোনার প্রভাবে দেশে নিম্নবিত্তের আয় ৭৫ ভাগ কমেছে। আগের তুলনায় চরম দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে ৬০ ভাগ। জরিপ অনুযায়ী, তাদের ৭২ শতাংশের কাজ কমে গেছে, নয়তো তারা আয়ের সুযোগ হারিয়েছেন। আট ভাগের কাজ থাকলেও মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থা রামরু বলছে, ১ কোটি প্রবাসীর মধ্যে, ইতোমধ্যে ৬ থেকে ৭ লাখ প্রবাসী কাজ হারিয়েছেন। কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও কয়েক লাখ। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনার কারণে বিশ্বে ৩৩ কোটি মানুষের আয় কমেছে। এটি বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় বেশি প্রভাব পড়ছে।

উল্লেখ্য, যাদের দৈনিক আয় ১০ থেকে ৪০ ডলারের মধ্যে, দেশে তারাই মধ্যবিত্ত। এ হিসাবে মধ্যবিত্তদের মাসিক আয় ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে।

গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকেই অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব পড়তে শুরু করে। সবকিছু বন্ধ থাকায় কমতে থাকে মানুষের আয়। প্রথমদিকে মধ্যবিত্তের ওপর তেমন প্রভাব না পড়লেও সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখন তারা গভীর সংকটে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে মধ্যম আয়ের লোকের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। এর মধ্যে ঢাকা শহরে আছে প্রায় ৮০ লাখ। সূত্র: বাংলানিউজ

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com